.
এইচ আইভি/এইডসঃ সংক্রমিত মানুষের অধিকার
- শামীম আল আমিন , প্রথম আলো, ২ এপ্রিল,২০০৬

গত দেড় মাসে দেশে পাঁচজন এইডস রোগী মারা গেছেন। আর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই রোগীরা মৃতু্যর আগে রাষ্ট্রের প েথেকে নূন্যতম চিকিৎসা সুবিধা পাননি। পাঁচ জনের একজন আবদুল হাকিম (ছদ্মনাম)। এইচআইভি সংক্রমিত আবদুল হাকিম পরে ক্যান্সরেও আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য তিনি ভিবিন্ন হাসপাতাল ও কিনিকে ছুটে বেড়ান। কিন্তু এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ায় কেউ তাকে চিকিৎসা দিতে রাজি হয়নি। চিকিৎসাবঞ্চিত হাকিম সিলেটে নিজ বাড়িতে মারা যান। বাকি চার জনের মৃতু্যও নিবিঘ্ন হয়নি। গত মাসে ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছয়জন এইডস রোগী চিকিৎসাদিন ছিলেন। তাদের হাসপাতালে সাত তলায় রাখা হয়। সেখানে নেই কোন রকম সুযোগ সুবিধা, এমনকি নেই পানির ব্যবস্থাও। সেবার হাত বাড়িয়ে দিতে কোনো চিকিৎসক সেখানে যান না। এই ছয় জনের চার জন হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। আশার আলো নামে একটি বেসরকারি সংস্থা তাদের দায়িত্ব নেয়। চার জনের তিনজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। অন্যজনের মৃতু্য হয় একটি কিনিকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে কয়েক জন মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে মারা গেলেন তার দায় কার? আশার আলোর র্নিবাহী পরিচালক হাবিবা আক্তার অভিযোগ করেন, দেশে এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিদেও মানবাধিকারের বিষয়টি দেখা উচিত। সমাজে তাদের আলাদা চোখে দেখা হচ্ছে। সামাজিক নানা কুসংস্কারের কারনে অনেকে তাই নিজের রোগটা গোপন করছেন। অথচ দেশের সংবিধান সবার সমান অধিকার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসাবে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ জীবনধারনের মৌলিক উপকরনের ব্যবস্থা কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে চিকিৎসকদের দায়-দায়িত্ব নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোনিয়েশনের (বিএমএ) সাভেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহাবুবের সঙ্গে। তিনি বলেন, সব মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সমান অধিকার আছে। চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকের র্কতব্য আর পাওয়া রোগীর অধিকার। ফলে এইচআইভি সংক্রমিত রোগীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসকের ভিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঝুঁকিয়ে এড়িয়ে চলতে আন্তজাতিক কিছু র্নিদেশনা রয়েছে। এসব র্নিদেশনা অনুসরন করে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।

এতো গেল একটি পরিপ্রেক্ষিত। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিন্ন আরও কিছু দিক রয়েছে। আজ কাল এইচআইভি/এইডস সংক্রমিত করা সন্ধান পাওয়া গেলে তা চট করে সংবাদ পত্রের পাতায় উঠে আসছে।

সংবাদপত্রের জন্য এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি বড় সংবাদ উপাদানে পরিণিত হয়েছে। মানুষের কৌতুহলের কথা বিবেচনা করে সংবাদপত্র তা তুলে ধরার আগ্রহ দেখায়। কিন্তু গণমাধ্যম বিশেষঞ্জরা মনে করেন এই তুলে ধরার মধ্যে একটা নিয়ম থাকা উচিত।

গত নভেম্বরে খুলনায় এক পরিবারের পাঁচ জন এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার একটি খবর আসে সংবাদপত্রে। এইচআইভি সংক্রমিত পরিবারটির সবার নাম-পরিচয় প্রকাশের ফলে পরিবারটির নাম সামাজিক বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে। এর আগে যশোরের ভিন্ন দুটো গ্রামে দুজন মেয়ে এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। স্থানীয় সংবাদপত্র গুলো তাদের ছবি সহ সংবাদ প্রকাশ করে। যার ফলে হয় একজন মেয়ের আত্নহত্যা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস সংবাদপত্রগুলোকে এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি এমনিতেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। তার উপর পরিচয় প্রকাশিত হলে সামাজিক নানা কুসংস্কারের কারণে সে বয়কটের শিকার হতে পারে। বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশুকে জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। তাছাড়া পাচারের শিকার হয়ে অনেক নারী দুর্ভাগ্যকে বরণ করে নিচ্ছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সংক্রমিত স্বামীর কারণে স্ত্রী সংক্রমিত হচ্ছে।

দেশে এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি: আজ থেকে ১৬ বছর বেশি সময় আগে ১৮৮৯ সালে দেশে প্রথমবারের মত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বও পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে এইচআইভি সংক্রমিতর সংখ্যা ৪৬৫ জন। ২০০৫ এর শেষ নাগাদ এই সংখ্যা কত তা জানায়নি সরকার। তবে স্থ্যমন্ত্রী ডা. খন্দকার মোশারফ হোসেন ফ্রেরোয়ারি মাসে জাতীয় সংসদে বলেছেন, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭৪ জন এইডস রোগী মারা গেছেন। এদিকে এইডস সম্পর্কিত যৌথ জাতিসংঘ কর্মসূচির (ইউএনএইডস) রিপোর্ট অন্যদিকে গ্লোবাল এইচআইভি/এইডস অ্যাপিডেমিক ২০০২ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে সম্ভাব্য এইচআইভি সংক্রমিতের সংখ্যা ১৩ হাজার। আর ২০০৪ সালের ডিসেম্বর থেকে সরকার বলেছে সম্ভাব্য সংখ্যা ৭০০ হাজার ৫০০। এইডস মানেই পাপের ফল নয়ঃ এইচআইভি/এইডস সমর্্পকে নানা ধরনের ভুল ধারনা সমাজে রয়েছে। অথচ নানা কারনে যে কেউ এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে। জাতীয় এইডস কমিটির টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অবঃ) এ এস এম মতিউর রহমান বলেন, অনিরাপাদ যৌন সম্পর্ক ছাড়াও দুসিত রক্ত শরীরে নেওয়া, একটি সিরিঞ্জ ব্যবহার কিংবা আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে সন্তার সংক্রামিত হতে পারে। ফলে মানুষের ধারনা পরিবর্তনের জন্য সঠিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।

নারীদের ঝূঁকি: এইচআইভি সংক্রমনের দিক থেকে নারীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আমাদের মতো দেশের বাস্তবাতায় পুরুষের তুলনায় নারীরা অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ আচরন করেও আক্রান্ত হচ্ছে স্বামীদের কারণে।

বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশুকে জোর পূর্বক দেহপসারনে বাধ্য করা হচ্ছে। তাছাড়া পাচারের শিকার হয়ে অনেক নারী দুর্ভাগ্যকে বরণ করে নিচ্ছে। যশোরের বেনাপোল সীমান্তবতী এলাকায় কয়েকটি গ্রামে সরজমিনে গিয়ে অনসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, সীমান্তবতী গ্রাগুলোর বিপুলসংখ্যক নারী চোরাচালান কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা বিভিন্ন সময় ভারত বাংলাদেশ উভয় দেশেরই সীসান্তরী বাহিনী সদস্যদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন।

অন্যদিকে বিভিন্ন নারী সংস্থার হিসাবে অনুযায়ী, প্রতিদিন সীমান্ত পথে হাজার হাজার নারী পাচারের শিকার হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরা যৌনকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। আর বিভিন্ন ভাবে যৌন হয়রানির শিকার এসব নারীদেও মাথায় এইটআইভা সংক্রামণের খড়গ ঝুলছে সব সময়ই।

বিপন্ন শিশু: মূলত শিশুরা তাদের পিতা মাতার কারণে এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অনেকেই মায়ের পেটে কিংবা জন্মানোর পর বুকের দুধ পান করে এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়। পৃথিবীজোড়ে শিশুরা নানা ভাবে পাচারের শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফের বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০০৪ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমিত অনূ্র্ধ্ব ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩১০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইডসের কারণে বাবা মায়ের মৃতু্যতে অনাথ হয়েছে ২ হাজার শিশু।

আমরা কি করতে পারিঃ দেশে এইচআইভি/এইডস নিয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভাইরাসটির সংক্রমন প্রতিরোধ করতে দেশে যথেষ্ট কার্যক্রম চলছে না। তবে আগের চেয়ে সচেতনতা বেড়েছে। গুরুত্ব পাচ্ছে বিষয়টি। কিন্তু সমাজ থেকে ভয়, কুসংষ্কার আর ভুল ধারণগুলোর দূর করা যাচ্ছেনা।

আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধের সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড.এ এস এম আমানুল্লা বলেন, মানুষের মধ্য থেকে ভীতি দূর করতে হবে। প্রচারণার বার্তাগুলো এমন হতে হবে যেন সর্বস্তরের মানুষ তা সহজেই বুঝতে পারেন। তা ছাড়া সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতির কথা মাথায় রেখে কর্মসূচি সাজাতে হবে। এইডস রোগীদের অধিকারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসতে হবে।
www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com