কুমিল্লা জেলার চৌদ্দ গ্রাম উপজেলার গুণবতী গ্রামের অধিবাসী আলমগীর হোসেন। আলমগীর হোসেন ২০০৩ সালের ১০ অক্টোবর মেডিক্যাল রিপোট অনুযায়ী ওই গ্রামের একমাত্র পরিপূর্ণ এইডস রোগী। বয়স ত্রিশ বৎসর। বেশ লম্বা, গায়ের রঙ পরিবারের অন্যান্য সদ্যসদের তুলনায় র্ফসা। অষ্টম শ্রেণীতেই লেখা পড়ার ইতি ঘটে। হয়ে যায় মটর মেকানিক। জেলা সদরের ওয়াকশপে কাজ শিখেছিল। এই পেশাকে অবলম্বন করে ২০০১ সালে পারিদিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। মাসে মাসে বাড়িতে টাকা প্রেরণ, সবার ভাল-মন্দ-খবরা-খবর নিয়ম মাফিক সবই ঠিক ছিলো। তারপর অদৃষ্ট। যৌবনের রঙে বেতাল হয়ে ভিনদেশী বন্ধুর হাত ধরে প্রথম প্রথম একটু আহার-পানাহার, এর পর একজন পশ্চিমা আর নেপালী মেয়ে হয়ে গেল শয্যা সঙ্গনী। কিন্তু ততদিনে নিজের অজান্তে বিষকনার বিষ ঢুকেগেছে তাঁর শরীরে। কোম্পানীর চার মাসের ছুটিতে গ্রামে ফিরে একমাস পর হতেনাহতেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। ডাক্তার পরীক্ষা করে শুনায় সে এইডসে আক্রান্ত।
আটাশ বছরের যবুক মফিজ পেশায় রাজমিস্ত্রী। বর্তমানে পেশাদার রক্তবিক্রেতা । ২০০৩ নভেম্বরের দিকে হঠাৎ জ্বর সাথে কাশিতে আক্রান্ত হয়। অনেক দিন রোগে ভুগে এক সময় সুস্থ হয়ে উঠলো। একমাস না যেতে আবার টাইফয়েডে আক্রান্ত হলো। ডাক্তার রক্ত পরীক্ষার রিপোট দেখে মত প্রকাশ করলেন সে এইডস জীবাণু বহন করছে।
স্বামী ও দুসন্তান নিয়ে স্বপ্নের সংসার সাজিয়েছিল কুসুম। কিন্তু তার স্বপ্ন বালির বাধেঁর মত ভেঙ্গে গেল। সে জানতেও পারলনা অনেক আগেই তার শরীরে বাসা বেঁধে ছিলো মরণব্যধি। ১৯৯৭ সালে যখন এইডস দরা পড়লো এরপর দীর্ঘ দেড় বছর চিকিৎসা করেও কোন রা পাওয়া গেলনা। কথাগুলো শেষ করার আগেই কান্নয় ভেঙ্গে পড়লেন কুসুমের ভাবী রেখে যাওয়া দুইন্তানের মাঝে বড়টির বয়স নয়, তবে শরীরে অবশ্য এইচ আইভি নেই। বার মাসের ছোটটির কপালে কি ঘটবে সৃষ্টিকর্তাই জানেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আঠারো মাস না হলে তার শরীরের এইচআইভি আছেকিনা ধরার উপায় নেই। অথচ শরীরে এইডস এর ভয়াল জীবানু নিয়ে স্বামী বেঁচে থাকলেও গৃহবধুকে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হলো।
যুগ যুগ ধরে সামাজের অসামাজিকতার দায় বয়ে বেড়াচ্ছে নারীরা। পুরুষ যখন তখন ভেঙ্গে দিবে নারীর আজন্মলালিত স্বপ্ন বিশ্বাস। ব্যবিচার বা অনাচার থেকে নিজে কে নিরাপদ রাখলেও স্বামী বা বন্ধুর শরীরের এইডস জীবানু যে কারও নিরাপদ জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। প্রবাস ফিরত স্বামীর মাধ্যমে এদের শরীরে এইডস সংক্রমন ঘটে। এইডস গবেষকরা বলেছেন, এটা আতংকের সংবাদ। একজন নিরাপদ গৃহবধু স্বামীর মাধ্যমে ঘাতক ব্যাধি এইডস রোগে আক্রান্ত হবে এটা কি সহজ ভাবে মেনে নেওয়া যায়? অথচ দিন দিন এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। সমপ্রতি ফ্রান্সের এক গবেষনা রিপোটে উল্লেখ করা হয় এইচআইভি সংক্রমিত মায়েরা সন্তান ধারনে যত বেশি দেরী করবেন তাদের অনাগত সন্তানের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মায়ের বয়স ২৫ বছরের কম হলে তার সন্তানের এইচআইছি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১৬ শতাংশ। আর মা যদি ৩৫ এর উধের্ব হয় তবে তার সন্তানের ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ বা দ্বিগুন। সমস্ত বিশ্বের এইডস আক্রান্তের মাঝে নারীর সংখ্যা বেশি। একজন এইডস আক্রান্ত মহিলা থেকে ১০০০ হাজার পুরুষ এইডস আক্রান্ত হতে পারে । কিন্তু এইডস আক্রান্ত পুরুষ থেকে এই রোগে ১০০ মহিলা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতি কম সংখ্যক দেশেই নারী থেকে পুরুষ আক্রান্ত সংখ্যা বেশি।
সাধারনত সমস্ত বিশ্বে সমীা চালিয়ে দেখা গেছে ু অল্প বয়সী নারীরাই বেশি সংখ্যক এইডসে আক্রান্ত। জাম্বিয়া টেলিভিশনের জনপ্রিয় রিপোটার ফেইথ কান্দাবা জানালেন-গোটা বিশ্বে মানব জাতির মধ্যে এইডস আক্রান্ত হবার ঝুঁকি মহিলাদের বেশি। সহবাস করার সময় একজন পুরুষ সিদ্ধান্ত নেয় সে নিরাপদ কোন পদ্দতির আশ্রয় নিবে কিনা। বিবাহিত দম্পতির ক্ষেত্রেও পুরুষ একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বে লাখ লাখ মহিলা ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষা ইত্যাদির কারনে যৌনকর্মীতে পরিণত হয়েছে। এইডস আক্রান্ত নারীর সংখ্যা বেশি হলেও এইডস বিশেষজ্ঞদের মতে ৮০ ভাগ এইডস ছড়ায় অসংযত যৌনাচারে। আর পুরুষই মূলভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশে ২৫ জন মহিলা এইডস রোগী হিসেবে সনাক্ত হয়েছে, তাদের অধিকাংশই স্বামীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে । ২০০০ সাল পর্যন্ত ১৭ জন এইডস রোগীর বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় চাকুরিতে ছিল। তাদের রক্তে রোগের জীবাণু পাওয়ায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এসব ব্যক্তির স্ত্রীও এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। এছাড়া বাংলাদেশে ভ্রাম্যমান পতিতা ও বিভিন্ন পতিতালয় এইডস বিস্তারের মোম জায়গায়। ১৮টি গণিকালয়ে মোট ৬০০০ হাজারের বেশি যৌনকর্মী রয়েছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৫০০০ হাজার ভাসমান মহিলা যৌনকর্মী রয়েছে। এর মাঝে ৭১% যৌনকর্মীর মাঝেই যৌনরোগের লক্ষণ রয়েছে । পেশাদার যৌনকর্মীদের নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের হার বিপদজনক ভাবে কম। এপর্যায়ে অর্থের জন্য বা অর্থের বিনিময়ে যেসব যৌন কাজ সংঘটিত হয়, উভয়ক্ষেত্রে নিরাপদ পদ্ধতি অত্যন্ত কম। মহিলা যৌনকমীদের যৌনসঙ্গীর উচ্চহার এবং যৌনকর্মে নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের নিম্নহার থেকে এটা স্পষ্ট যে, যদি এদের কোন একজনের মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ ঘটে তবে তা কনডম ব্যবহারের নিয়হারের কারনে দ্রুত সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে। দেশে নারী পুরুষের বিবাহিত মাঝে শতকরা ৮৯% নারী এবং ৮১% পুরুষ যৌন সম্পর্কিত রোগে সম্পর্কে অজ্ঞ। এ হার অবিশ্বাস্য যে ৯৬ ভাগ মহিল যাদের বয়স ১৫-১৯ বছর এইডসের বিষয়ে অসেচতন এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ৮৮ ভাগ, যাদের বয়স ১৫-১৯ বছর । আর যৌনরোগের ক্ষেত্রে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ মহিলা দ্বিধাবোধ করেন। জটিল ও যৌনরোগ সংক্রান্ত প্রকাশকে অনেক মহিলাই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অসম্মানজনক মনে করেন। ফলে এইডস আক্রান্তরা উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করানো এবং এইডস অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি বিধায় অনেক ক্ষেত্রেই নারীদেও জন্য পারিবারিক ভাবে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। প্রজনন স্বাস্থ্যসহ নারীর সু রার ক্ষেত্রে, পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি পারিবারিকভাবে উদ্যোগ গ্রহন জরুরী। নারী শুধু পণ্য বা আনন্দ উপকরণ এ পুরনো ধারণা ভেঙে সমাজ পৃথিবীর অস্তিত্ব রার জন্যই নারীকে তার সঠিক অবস্থান দিয়ে ন্যায্য আচরণ করা পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্যই অপরিহার্য।
একটি সরকারী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের পশ্চিম নদীর বন্দর এবং ফেরী ঘাট গোয়ালন্দের। সনি্নকটস্থ একটি পতিতালয়ে সরে জমিনে পরীা কওে এইচআইভি বহনকারি সাত জন কে সনাক্ত করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে মোট রক্তের চাহিদার শতকরা সত্তর ভাগ থেকে পচাত্তর ভাগ অর্থাৎ প্রায় দুই লাখ ইউনিট রক্ত পেশাদার রক্তদাতার শতকরা বিশ ভাগই হেপাটাইটিস বি অথবা সিফিলিসে আক্রান্ত। রক্তদাতা ও রক্তগ্রহিতার মাধ্যমেও এইডস রোগ বিস্তারের প্রবল সম্ভবনা থাকে।বাংলাদেশে পেশাজীবি যৌনকর্মী সংখ্যা প্রায় ১ লা। এরা প্রত্যেকেই দুই থেকে পাঁচজন খদ্দেরের যৌন চাহিদা মিটায়। এ হিসাবে প্রতিদিন ৫ লাখ পুরুষ পতিতাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সংস্পর্শে আসে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হেলথ সার্ভিসেস সোসাইটির জরিপে উল্লেখ করা হয় এসব যৌবন কর্মীদের প্রায় প্রত্যেকেরই বিভিন্ন যৌনরোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অভিমত বাংলাদেশে এখনই এইডস প্রতিরোধের উপযুক্ত সময়। জন-সচেতনতা সৃষ্টি, মানুষের মাঝে নৈতিক-মানবিক ও ধর্মীয় চেতনার বিকাশ যতো ঘটবে এইডস নামক ঘাতক ততো বেশি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এই বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি জাগ্রত করতে হবে আমাদের তরুণ ও সমাজকে। তা-না হলে আমাদের আগামী ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন।
ইয়াসমীন রীমাঃ সাংবাদিক ,কুমিল্লা ।
|