.
সীমান্ত চোরাচালনে নারী পুরুষের বহুগামিতায় ঝুঁকিপূর্ন এইচআইভি/এইডস
- ইয়াসমীন রীমা / দৈনিক সংবাদ, ২৪ এপ্রিল, ২০০৬

কুমিল্লা শহরের পৌরপার্ক আর টাউনহল ময়দান শহীদ মিনারের পশ্চাতে শুয়ে বসে দিন কাটে ভাসমান পতিতা পারুল,২৩ সালমা ২০ মিতা ২০ ও রহিমা,২৩। রাত কাটে খদ্দরের ইচ্ছেমতো এখানে সেখানে। তারা যৌনরোগ বা এইডস সম্পর্কে কিছুই জানেনা। রহিমা বলেন- শরীর বেঁচতে এসেছি খদ্দেরের ইচ্ছেমতো শরীর কিনবে। আমি একা কনডম দিয়ে কি করব?

তারা শুধু পৌর পার্ক বা শহীদমিনার এলাকাতেই নয়,শহরের ষ্টেডিয়াম,রেলওয়ে ষ্টেশন,নির্জন খোলাস্থানে ঘুরাফেরা করে ও কর্ম চালিয়ে যায়। তাদের মতো প্রায় এক থেকে দেড়শ পতিতা প্রতিদিন শহরে আসা-যাওয়া করে। প্রত্যেকই স্বাস্থ্য সম্পর্ককে অসচেতন এবং নানারকম যৌনরোগে আক্রান্ত। এসব যৌনকর্মীর ৬০ শতাংশ সঙ্গী কনডম ব্যবহার করে না। যৌনকর্মীদের ৮৮ শতাংশ যৌন রোগে আক্রান্ত। যৌন রোগে আক্রান্ত যৌনকর্মী ও তাদের সঙ্গীদের ৫২ শতাংশ কোন প্রকার চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না। বিভিন্ন কারখানায কর্মরত প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক,১৯ হাজার রিক্সাচালক ও ৫ হাজার ট্রাকচালক কুমিল্লা শহরে বাস করে। যাদের সিংহ ভাগ ভাসমান যৌনকর্মীদের খদ্দের। এছাড়াও আছে আবাসিক বা অনাবাসিক ভিত্তিতে গৃহস্থালি কাজ করা নারী,যাদর স্বেচ্ছায বা বাধ্য হয়ে অন্যান্য সেবার পাশাপাশি যৌনসেবা দিচ্ছে। আরো আছে সেসব মেয়েরা যারা বিভিন্নেেত্র সুযোগ-সুবিধা বা উপহারের প্রয়োজনে অস্থায়ী ভিত্তিতে করছে যৌনকর্মীর কাজ।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন- "এসব যৌনকর্মী এবং তাদের গ্রাহকের এইচআইভি/এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। অরজ্ঞানহীন এসব গ্রাহক অর্থাভাবে ও সামাজিক কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়না। এ-ধরণের গ্রাহক শহীদ, রাসেল দেলোয়ার বলেন-"সুবিধাজনক কাউকে পেলেই চলে। কোন রোগ আছে কিনা সেটা যাচাই করার সময় কোথায়?" ফলে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই সিফিলিস ও গনোরিয়াসহ নানা যৌনরোগে ভুগছে । আর কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডাঃ আবদুল কাদের মিয়ার মতামত হচ্ছে-"সরকারিভাবে আমরা শুধু টেকনিক্যাল দিকগুলি দেখি অথাৎ জেলা তথ্য অফিস,এনজিও, ইসলামী ফাউন্ডেশন ইত্যাদির মাধ্যমে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও প্রশিণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। আমরা ওখানে গিয়ে শুধু বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দিয়ে আসি।" এইডস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রন আওতায় এইচআইভি/এইডস পরীক্ষা কোথায় করা হয় জানতে চাইলে তিনি জানান,- কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ ও জেলা সদর হাসপাতালে।

কেয়ার (CARE) এর এক সমীক্ষায় উল্লেখ্য করেন-১৮টি গনিকালয়ে মোট ৬০০০ হাজারের বেশি সংখ্যক যৌনকর্মী রয়েছে। এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৫০০০ হাজার ভাসমান মহিলা যৌনকর্মী আছে। এর মাঝে প্রায় ৭১%যৌনকর্মীর মাঝেই যৌনরোগের লন রয়েছে। রাজশাহীতে ৪৩০ এবং ঢাকায় ৪৫০জন ড্রাগ আশক্তির ব্যক্তির উপর এক সমীক্ষয় দেখা যায়-শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে ৮৫ভাগই ঢাকায় ৭% এবং রাজশাহী ৫% যৌনকর্মীদের সঙ্গে যৌনচাহিদা মিটিয়ে থাকে। পেশাদার যৌনকর্মীদের নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের হার বিপদজনকভাবে কম এ-পর্যায়ে অর্থের জন্য বা অর্থের বিনিময়ে যে সব যৌন কর্ম সংগঠিত হয়,উভয়েক্ষত্রে নিরাপদ পদ্ধতি অত্যন্ত কম। মহিলা যৌনকর্মীদের যৌনসঙ্গীর উচ্চহার এবং যৌনকর্মে নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের নিম্মহার থেকে এটা স্পষ্ট যে যদি এদের কোন একজনের মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ ঘটে,তবে তা কনডম ব্যবহারের নিন্মহারের কারণে দ্রুত সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। সরকারের চতুর্থ সেরোলজিক্যাল সার্ভিলেন্স প্রতিবেদনে উল্লেখ,যৌনকর্মীদের যৌন সঙ্গীর সংখ্যা এশিয়ার অন্য যেকোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অধিক হলেও যৌনকর্মে কনডম ব্যবহারের হার এখানে সর্বনিন্ম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী,এদেশে পতিতালয়,হোটেল যৌনকর্মী এবং ভাসমান যৌনকর্মীদের খদ্দেরদের মধ্যে শতকরা ৯৮ভাগ হোটেলে অবস্থানকারী যৌনকর্মীদের শতকরা ৯৬ভাগ কনডম ব্যবহার করেনা। রিক্সা ও ট্রাক চালকদের দুই-তৃতীয়াংশ কখনোই কনডম ব্যবহার করেনা। পুরুষ সমকামীদের মধ্যে কনডম ব্যবহারের হার আরো কম। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এশিয়া- প্যাসেফিক ডিজিজ এ্যাটক ব্রেক সার্ভিলেন্স প্রতিবেদনে উল্লেখ,এদেশে পেশাদার যৌনকর্মীদের সঙ্গে যৌনক্রিয়া ক্ষেত্রে খুব কম কনডম ব্যবহৃত হয়। ফলে এটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ,যা দেশটিকে এইডস মহামারীর দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশে মাত্র দুই থেকে চার ভাগ যৌনকর্মী খদ্দেরদের বেলায় কনডম ব্যবহার করেন।

সমপ্রতি বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের এক পরিসংখ্যান রিপোর্টে উল্লেখ-সারা দেশে প্রায় দেড় ল চোরাচালানী এইডসের জীবানু বহন করছে। এসব এলাকায় চোরাচালান কাজে নিয়োজিত নারী-পুরুষ ও কিশোর/কিশোরী সবাই এইডস ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সীমান্ত চোরাচালান কাজে জড়িত নারী-পুরুষের বহুগামিতা,অসচেতনার কারনে এইচআইভি/এইডস এর সম্ভবনা প্রকট হয়ে উঠেছে। চোরাচালান কাজে নারী অংশগ্রহন ক্রমেই বাড়ছে। অত্যন্ত দরিদ্রশ্রেনীর এসব নারীরা নিতান্ত পেটের দায়ে চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও বিডিআরের হাতে প্রতিনিয়ত এরা ধরা পড়ছে। আটক অবস্থায় দিনের পরদিন তাদের ওপর চলে যৌননির্যাতন। ছাড়া পেয়ে দেশে এসে এরাই আবার স্বামীর সাথে মিলিত হচেছ। আবার অনেকে নির্বিঘ্নে পণ্য নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেযার জন্যে ভারতীয় সীমান্ত রীদের সাথে স্বেচ্ছায় যৌনক্রিয়া অংশগ্রহন করছে।স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডার পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে এইডস ভাইরাস সংক্রমিত হবার কয়েকটি মাধ্যমের মধ্যে একটি হলো ট্র্যাক ড্রাইভার। দেশের সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে ১০টি ক্রস বর্ডার জোন আছে। এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০০০ হাজার ট্রাক এ-দেশে আসে। ট্র্যাক ড্রাইভারসহ এদের সঙ্গে আরো দু'জন হেলপার কমপক্ষে ৭ থেকে ১০দিন অবস্থান করে থাকে। আমাদের দেশের পতিতালয়ে গমনের ফলে যৌনকর্মীদের এইডস রোগসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ প্রোপটে এইচআইভি সংক্রমনে অভিবাসি শ্রমিকদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ অভিবাসি শ্রমিকদের অধিকাংশই স্বল্প শিতি কিংবা অশিতি। অভিবাসনের আগে বা পরে এইডস/এইচআইভি পজেটিভ,নিরাপদ কোনো পদ্ধতি সম্পর্কিত শিক্ষা বা কাউন্সিলিং এর কোন সুযোগ না থাকায় বিদেশে যাবার পর সামাজিকপ্রোপট বদলের সাথে সাথে প্রবাসের নিঃসঙ্গ ও একাকী জীবন,অর্থ ,যৌনকর্মী সহজলভ্যতার জন্য এইডস বিস্তারের মূল কারন। বিদেশ ফিরে আসা শ্রমিকের শতকরা ৫৩ জনের এইডস সম্পককে অজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির একটি বিরাট অংশ এখনো জানেনা যে এইচআইভি কিভাবে একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। একজন ট্র্যাকচালক এবং রিক্সাচালকের বছরে ৬ থেকে ১০জন যৌনসঙ্গী থাকে। অন্যদিকে যৌনপল্লীর (ব্রোথেলের) একজন মহিলা যৌনকর্মীর প্রতিসপ্তাহ যৌনসঙ্গীর গড় সংখ্যা ১৮.৮জন এবং হোটেলের একজন যৌনকর্মীর সপ্তাহ প্রতি যৌনসঙ্গীর গড় সংখ্যা ৪৪জন যা এশিয়ার অন্য যে কোন দেশের তুলনায় অত্যাধিক। আর শতকরা ১১.৫৯ভাগ লোক জানে না যে এইডস একটি যৌনবাহিত রোগ এবং শতকরা ৫৪ভাগের ধারণা এইডস আক্রান্ত রোগীর সাথে যৌন চাহিদা মিটালে এইডস হয়।

এদিকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'দৃষ্টি' HIV-STI Prevention Project এর মাধ্যমে যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করেছেন। ডিসেম্বর০৫ থেকে শুরু করেছেন তাদের কাউন্সিলিং সেবা , সপ্তাহে একদিন বিনা খরচে চিকিৎসা সেবা, আয়বর্ধকমূলক ট্রেনিং অথর্াৎ সেলাই,ঠোঙ্গা তৈরি, গরুছাগল পালন ইত্যাদি প্রশিণ নিচ্ছেন। ৭জন ভাসমান যৌনকর্মীসহ অন্যান্য ৫জন। এছাড়া ট্রেনিং এর মাধ্যমে আচরনগত পরিবর্তন অথাৎ কনডম প্রোগামে যৌনকর্মীরা তাদের গ্রাহকে কনডম ব্যবহারে উদ্ধুদ্ধকরণের প্রক্রিয়াগুলি জন্য Behaviar Change Communication প্রশিণ দিচ্ছেন। দৃষ্টির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শারমীন কাদের বলেন- প্রধান সমস্যা হলো বাংলাদেশের পুরুষরা যৌনকর্মীদের কাছে যাওয়ার প্রাক্কালে যৌন নিরাপত্তাকে অসন্মানজনক মনে করে। এমনকি নিরাপত্তা উপকরন ব্যবহারের অনুরোধ জানানের ফলে গ্রাহকের প থেকে মারধরে যৌনকর্মী আহত হবার ঘটনাও ঘটেছে। ২০০৩ সালে সর্বপ্রথম ২০টি হোটেলে ৪২০জন যৌনকর্মীকে STI ( Sexually Transmitted Infections) কিনিকের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে তাদের মধ্যে STI ( Sexually Transmitted Infections) Case study ছিলো ২৯০ জনের এবং এর মধ্যে এইচআইভি পজিটিভ ১৫৫জন।

সমপ্রতি দৃষ্টির ট্রেনিং প্রোগামের মাধ্যমে এইচ আইভি/এইডস বিষয়ে ধারনা পেয়েছেন এইচআইভি পজেটিভ মাসুমা,৩২ (ছন্দনাম) তার ভাষায়-"প্রথমদিন ডাক্তার আপার মুখে এইচআইভি/এইডস এর কথা শুনে মনে হয়েছিলো "এটা গরীবের ঘোড়া রোগ"। কিন্তু গত তিনমাসে ধীরে ধীরে বিভিন্ন যৌনরোগ সম্পককে ধারনা হয়েছে।

তবে অধিকাংশ যৌনকর্মীদের এইচআইভি/ এইডস বিষয়ে অজ্ঞতা রয়েছে। আর ভাসমান যৌনকর্মী সালমা বলেন-" নিজেদের খাওয়া পরার টাকা যোগাড় করতে হিমসিম খেতে হয়,বাছ-বিচারের কোনও সুযোগ কই? গ্রাহকই আমাদের ভরসা"।


ইয়াসমীন রীমা
হোসেন মঞ্জিল,শাসনগাছা,কুমিল্লা।
মোবাইল-০১৭১১১৭৩৭৩৮
ফোন-০৮১-৬১২৩৪,৬১৫৪৯,৭৬৫৫৬,৬২৬৩৮
www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com