সবার মতোই আমাকে জন্ম দিতে আমার মা গর্ভে ধারণ করেছিলেন দশমান দশদিন। পেয়েছেন নাড়িছোঁড়া তীব্র কষ্ট, তবুও সৃষ্টিকর্তার এ কেমন খেয়ালে অন্য দশজন থেকে আমরা কত আলাদা। অসম্পূর্ণ এক রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। আর আলাদা হয়ে প্রতিনিয়ত সমাজের চোখে ঘৃণিত হতে হতে কান্ত হয়ে গেছি। আমার পোশাকি নাম হিজড়া, আঞ্চলিকতায় মাফু, কুটি। বয়স বাড়তে দেহের দৈন্য যখন পরিবার বুঝতে পেরেছে তখন স্থান হয়েছে অন্য সমাজে। এই যে বাচ্চা নাচানো বিয়েশাদীতে গীত গাওয়া, নাচনা এটা আমাদের রম্পারা। একমান রোজগারের উৎস। এতে আর কত আয় হয়? কথাগুলো বলতে বলতে এক সময় থেমে গেলেন শুক্না কুমিল্লা শহরে উপকন্ঠ থেকে গোবিন্দপুরের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার। ওখানেই শুক্নার বর্তমান আশ্রয়স্থাল। এলাকাটা সদর উপজেলার অধীনে হলেও শহরতালি রয়ে গেছে এখনও। অনেকটা বস্তি এলাকায় সেখানে বিশেষ করে নিম্নস্তরের বিভিন্ন পেশার মানুষ বসবাস করে। শুকা ছাড়াও ওখানে বাস করে ভাবনা, পিংকি, জিন্দিগীসহ আরও অনেকে। কুমিল্লা জেলার মোট হিজড়ার সংখ্যা কত? এর সাঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও প্রায় ২০০ জনের বেশি হিজড়া বাস করে কুমিল্লায়। এরা কুমিল্লা শহরের মোগলটুলি, শাসনগাছা, সাতরা, রামমালা, ঢুলিপাড়া এবং গোবিন্দপুর ছাড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। এর মধ্যে গোবিন্দপুরেই তাদের সংখ্যা বেশি। এখানে প্রায় ৭০ জনের বেশি হিজড়া বাস করে। তাদের মূল পেশা হচ্ছে। নাচ-গান করা। তারা কখনও পুরুষের পোশাক পরে আবার কখনও নারীর পোশাক পরিধান করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা নারীর বসন ব্যবহার করে। তাদরে আচার আচরণে নারী এবং পুরুষের আচরণের মিশ্রভাব ল্য করা যায়। হিজড়া, ছিবড়ি, খোঁজা, নপুংশক, কীব, পোতা যতনামেই তাদের ডাকা হোক না কেন এ সমাজিক প্রজাতির ওপর কৌতূহল থাকলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু একটা ভয় ও সন্দেহের অদৃশ্য দেয়ার ওঠে গেছে। সত্য সমাজের জন্য যৌনতায় মানুষ। তারা দরিদ্র, অনেকেই অপরাধ জগতের সঙ্গে লিপ্ত এবং ঘৃণা ও করুণার পাত্র। শিশুর জন্ম উপল েএবং বিবাহ অনুষ্ঠানে নাচপান করা তাদের এমাত্র বৈধ রোজগারের উপায়, তাতে পেট পুরে খাওয়া যায় না।
পিংকির সঙ্গে থাকে গুরুমা, তার শিষ্যরা যা রোজগার করে তা সমানভাবে ভাগাভাগি হয় এবং তার একটি নির্দিষ্ট অংশ গুরুমা পান, তা দিয়ে ঘরের যাবতীয় খরচ চলে। এ ব্যবস্থায় মধ্যে বঞ্চনা ও তিক্ততার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। পেশাদার সমকামী ভাবনা বলেন, আমি ছোটকাল থে েক চট্টগ্রাম ছিলা, চার মাস হলো এখানে এসেছি। হঠাৎ জ্বর ও পাতলা পায়খানায় আমার ওজন অনেক কমে গেলে সাড়া শরীরের ফোস্কা পড়ে গেছে। গত ৩ বছর ধরে জলনা (গনোরিয়া, সিফিলিস) রোগে ভুগছি। শরীরের এ অবস্থায় রোজগারের ঝাপে লাঠি (ব্যবসা বন্ধ) ওঠে গেছে। জেলফেরত কয়েদি, দারোয়ান থেকে শুরু করে কমবেশি সব ধরনের লোকই আমার জুড়িদার (সঙ্গী) ছিলেন। ভাল রোজগারের জন্য এখানে আসা। সমপ্রতি খুলনা থেকে পিংকি শুকাদের প্রধান গুরুমা মর্জিনা নিমি্ন ঘুরে এসেছেন এবং খুলনা ছিলেন বেশ ব্যস্ততার মধ্যে। কারণ পতিতাপল্লীর মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন, এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে বেশ সচেতন হয়েছেন। তাই তো পিংকির জ্বর আর মুখে ঘা হওয়ার পর তিনি এক মূহূর্ত অপো না করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কাছে গিয়ে পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন।
বিবাহ ও প্রজননকেন্দ্রিক সমাজে অন্য যৌনতার স্থান নেই, অথচ যৌনতার রোধ এবং আত্নারোধ একই বিষয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ হিজড়া সমাজ সব রকমের জন্য যৌনতার মানুষের আশ্রয়। সবচেয়ে বড় কথা এ সমাজের অন্তর্গত হলে নিজের পরিচয় না লুকিয়েই দেহ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু হিজড়াদের মধ্যে যৌনজীবন সমকামিতার ভূমিকা নিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তরা বলেন, অনেক রকম যৌনতার মধ্যে এক রকম দেহব্যবসা করে যা সমকামিতাকে জীবনের সত্য বলে বরণ করে নেয়। জেলখানায় পুরনো কয়েদিদের মধ্যেও সমকামিতা প্রবল। নতুন কয়েদিরা এক্ষেত্রে প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের কারাগারগুলোতেও এ সমস্যা বিরাজমান। উঠতি বয়সের তরুণ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক কয়েদিরা অনেক ক্ষেত্রেই ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। এশিয়ার দেশগুলোতে মানবাধিকার ও এইচআইভি/এইডস নিয়ে বসবাসকারী মানুষের জন্য সুযোগ-সুবিধা ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে খুবই কম তৈরি হয়েছে।
যৌন বিকৃতির একটি বিকৃতি হচ্ছে Oral Sex. হিজড়া ও পথশিশুদের ওপর এক জরিপে দেখা যায় এক সপ্তাহে ৮৮ ভাগ হিজড়া Oral Sex. এ লিপ্ত হয়। এক্ষেত্রে ৯৫ ভাগই কনডম ছাড়া সম্পাদন করে। পুরুষ যৌনকামী যারা মূলত পুরুষের সঙ্গেই যৌনকর্ম করে থাকে। তবে কারও মধ্যে উভয়লিঙ্গের প্রতিই আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। ঢাকায় আশপাশে অবস্থানরত ৪০৭ জন পুরুষ যৌনকমীর Men who have sex with men (MSM) ওপর সমীক্ষা চারিয়ে দেখা যায় তাদের বষয় ১১ থেকে ৫৫- এর মধ্যে এবং ৫৫ ভাগই ১৮ থেকে ২৪ বয়সের। এক সপ্তাহে ৯৮ ভাগ অন্য পুরুষের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে যৌনকর্ম করেছে। এ বাণিজ্যিক যৌনকর্ম অধিকাংশ ক্ষেত্রেরই সুরতি নয়। ন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর লেইসবিয়ান অ্যান্ড গে লিবারেশনের ওয়াকিং কমিটির সদসন্য ইভা তার প্রবন্ধের এক অংশ উল্লেখ করেন আমাদরে সমাজে স্বাভাবিক সুস্থতার মানদগু হচ্ছে বাইসেক্সোয়ালিটি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সমকামীগ্রবণতা মানুষের জন্মগত। এখানে জোর করার কিছু নেই। কেউ চাইলেই সমকারী হতে পারে না। যৌন বিজ্ঞানীরা এ প্রবণতার সঙ্গে সমকামী নর-নারীর মানসিক বিকৃতির যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক এ অবস্থান সমকামী নর-নারীর অবসাদ, হীনম্মন্যতা উস্ক দেয়। চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আবদুর মান্নান বলেন পাযুপথে যৌনমিলন এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ এ ধরণের যৌনমিলনে পায়ুপথের মিউকাস আবরণ ছিঁড়ে ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে যা এএইচআইভি ত্বরাম্বিত করে। সাধারণত পুরুষ সমকামীরা পায়ুপথে যৌনমিলনে অভ্যন্ত। তাই এইচআইভি/এইডস বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ মহিলা যৌনকর্মীর পক্ষে জানা বা বোঝা সম্ভব নয় যে তার যৌনসঙ্গীর অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক আছে কি নেই। তবে নিঃসন্দেহে কোন মহিলা যৌনকমীর ক্ষেত্রে পুরুষ সমকামী যৌনসঙ্গী অন্য পুরুষ যৌনসঙ্গীর তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তাদরে সবার মধ্যকার প্রত্য বা পরো যোগাযোগ সবার জন্যই কমবেশি ঝুঁকি বহন করছে।
এশিয়া অঞ্চলে ২০০৫ সালে প্রায় ৮.৩ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছে যার মধ্যে ২.০ মিলিয়নই হচ্ছে মহিলা। ২০০৫ সালে এশিয়ায় এ রোগে মৃতু্যবরণ করেছে প্রায় ০.৪ মিলিয়ন এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১.১ মিলিয়ন। ভারত ২০০৫ সালে এসে তা ৫.০ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই ভারতের পার্শ্ববতী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এ রোগে ভয়াবহ আকার-ছড়িয়ে পড়ার আশস্কা দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই রোগাক্রান্ত হওয়ার পরও চিকিৎসকের কাছে যান না। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলে রোগটি শনাক্তকরণেও যথাযথ ব্যবস্থা নেই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা WHO, UNAIDS ও FHI তাদের পরিচালিত সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫০০। ঢাকা ও তার পাশ্ববতী এলাকায় এ হার ৪.৯। এই পরিসংখ্যান সঠিক হলে এইডস প্রতিরোধ আমাদের আরও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দৃষ্টির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শামিন কাদের বলেন, এ বছরের শুরু থেকে হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছি। তবে তারা অত্যন্ত লুকানো একটি গোষ্ঠী। সাধারণ যৌনকমর্ীদের তুলনায় এইচআইভি/এইডস বিস্তারের ক্ষেত্রের তারা শতভাগ ঝুঁকিপূর্ণ। দৃষ্টি ড্রপিং সেন্টারের মাধ্যমে দিনে বিশ্রাম নেয়া, কাউন্সিলিয় এবং HIV and STI Prevention project এর আওতায় সপ্তাহে দু'দিন সংস্থার কিনিকে STI (Sexually Transmitted Infection) স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটা তাদরে অনিশ্চিয়তা হলেও দিনের আলোর উদ্যত্ত ব্যবহার, নগ্ন গালাগাল, অভব্যতাকে বাঁচার অস্ত্র করে সমাজের দাঁতাল উপহাসকে প্রতিহত করে নিয়ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আজকের হিজড়ারা। সমাজের বিপরীতে অবস্থান নিয়েও টিকে থাকার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে পিংকি ভাবনা ও শুক্লারা ।
|