.
রক্তের চাহিদার কাছে নিরাপত্তা গৌণ হচ্ছে
-কুররাতুল-আইন-তাহ্মিনা, প্রথম আলো ০২-১২-০৬

কয়েক বছর আগে খুলনায় উচ্চবিত্ত পরিবারের এক নারীর রক্তে এইচআইভি সংক্রমণ পাওয়া যায়। তাঁর স্বামী ও ভাইরাস মুক্ত ছিলেন। খোঁজখবর করে চিকিৎসকদের ধারণা হয়, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া রক্তের মাধ্যমে তিনি ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ১৯৯৪ সালে প্রথম বাচ্চা হওয়ার সময় খুলনার কামরুদ্দিনের (প্রকৃত নাম নয়) স্ত্রীকে ছয় ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল এ হাসপাতালেই। ২০০৫ সালে তাঁর রক্তে এইচআইভ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, পেশাদার রক্তদাতাদের কাছে থেকে কেনা ওই রক্তই তাঁর দেহে ভাইরাসটি দিয়েছিল। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে সরকার নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচি (এসবিটিপি) চালু করে। তার আগে দেশে পরীা-নিরীা করে রক্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। মূলত দেশজুড়ে ৯৮টি সরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানের রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র বা ব্লাডব্যাংকে এ কর্মসূচি চলছে। এর ল্য কাউকে রক্ত দেওয়ার আগে পাঁচটি রক্তবাহী রোগের ভাইরার্স বা জীবাণুর জন্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা। রোগগুলো হচ্ছে এইচআইভি হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়া। আরক ল্য রক্ত বেচাকেনা নিরুৎসাহিত করা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রসার ঘটানো। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিরন্ধন নিয়ে দেশে বেসরকারি কিনিক আছে এক হাজার ২০৫ টি, আর রোগ নির্ণয় কেন্দ্র আছে এক হাজার ৫০২ টি। অননুমোদিত কিনিক আর ব্লাডব্যাংক আছে আরও অনেক। রক্ত পরিসঞ্চালন যে কতজন করে, তা একেবারেই গোনাগাঁধা নেই।

রক্তের নিরাপত্তার খোঁজ: ২০০২ সালের এপ্রিলে সংসদে পাস হয়েছে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন তবে সেটা কার্যকর হয় ১ আগষ্ট ২০০৪-এ। বিধি হতে লাগ েআরও নয় মাস। অনিরীকিতি রক্ত দেওয়া এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স ছাড়া বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চলন কেন্দ্র চালানো এ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এর প্রয়োগ শূন্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সূত্রে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি ব্লাডব্যাংকগুলো একটিরও লাইসেন্স নেই। গত একবছরে লাইসেন্সর জন্য দুই-একবার আবেদন আহবান করা হলে সাড়া দিয়েছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান। অধিদপ্তরও বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিসঞ্চালনে ব্যবহৃত বিনষ্টযোগ্য বা ডিসপোজেবল সরঞ্জাম নষ্ট না করলে বা আবার ব্যবহার কররে এ আইনে শাস্তির বিধান আছে। তবে এইচআইভি/এইডস বিষয়ে কর্মরতরা বলছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটা সবাই করছে কি না তা বলা কঠিন। অন্ত্রপাতি-সরঞ্জাম কতটা জীবানূমুক্ত করে নেওয়া হয় তা দিয়েও উদ্বেগের কারণ আছে। তাঁরা বিশেষ করে দাঁতের চিকিৎসার বিষয়ে চিন্তিত। সরকারের এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ প্রকল্পের (হ্যাপ) আওতার এসবিটিপিতে এখন টাকা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। দাতা প্রতিষ্ঠানটির

রক্তের চাহিদার কাছে নিরাপত্তা গৌণ হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. দীনেশ নায়ার প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি খাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে এসবিটিপি কিছুটা অগ্রসর হয়েছে। তবে দুশ্চিন্তা আছে রক্ত পরিসঞ্চালনের মান ও কার্যকারিতা, জোরদার স্বাচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমের অভাব এবং ব্যক্তিখাতের রিপোট ও অনিয়ন্ত্রিত রক্ত পরিসঞ্চালন বাজার নিয়ে। তিনি আরও বলেন রক্তের অপ্রতুল জোগান বাড়ানো খুব জরুরি।

রক্তের চাহিদা:
বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে রক্তে বার্ষিক চাহিদা আড়াই থেকে তিন লাখ ব্যাগ। এসবিটিপির জাতীয় সমন্বয়কারী ডা. মুরাদ সুলতান বলছেনম, তাঁদের আওতাভুক্ত কেন্দ্রগুলো এর প্রায় ৭০ শতাংশ মেটাতে পারে। বাকিটার বড় অংশ মেটায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানী। এসবিটিপি কেন্দ্রগুলো ৬৪টি জেলায় হয় সদর হাসপাতাল, নয় মেডিকেল কলেজ বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান-হাসপাতালে বিস্তৃত। এ পর্যন্ত নিরাপদ রক্ত তবু আশা করা যায়। কিন্তু এখন উপজেলায়ও বেসরকারিভাবে রক্ত পরিসঞ্চালন হচ্ছে। ডা, সুলতানের মতে রক্তের বার্ষিক চাহিদা আসলে পাঁচ লাখ ব্যাগের কম হবে না। এ চাহিদার একটা বড় অংশই হয়ত বেসরকারি অনিয়ন্ত্রিত রক্তের বাজার থেকে মিটছে।

রক্ত- বাণিজ্যঃ সাড়ে পাঁচ শত টাকা করে ব্যাগ পড়বে। কাগজপত্র নিয়া আসেন। যত রক্ত চান এইখানে আছে। রক্ত ভালো তো? উত্তরে ছোটখাটো ওই কর্মচারী বলেন, আমাদের চারটা টেষ্ট করা, এইচআইভসহ। দোকান দেখলে অবশ্য ভরসা হয় না। ছোট্ট একফালি ঘরে অয়েলকথে ঢাকা সরু একটি বিছানা। টুলে বসে ঢুলছেন আরেক ব্যক্তি। ২৩ নভেম্বর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাডব্যাংকে গিয়ে ও পজিটিভ রক্তের খোঁজ করলে কর্তব্যরত টেকনোলজিষ্ট জানান, নেই। পরে হাসপাতালেরই এক দালাল এ দোকানের হদিস দেন। তিনি বলেছিলেন, মেডিকেলের যত রোগীর ব্লাড লাগে, বেশির ভাগ ওইখান থেইকা আনে। চানখাঁর পুল চৌরাস্তার মোড়ে কাজী অফিসের ওপর দোকানটির বাইরে কোনো সাইনবোর্ড নেই তবে কর্মচারী একটা কার্ড দিলেন ডোনার ব্লাড অ্যাল্ড প্যাথলজি সেন্টার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানান, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কোয়ান্টম বা হার্ট ফাইন্ডেশনের মতো ভালো রক্ত কেন্দ্রগুলোরও কোনো লাইসেন্স নেই। অনেক রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের লাইসেন্স নিয়ে চলছে। সূত্রটি জানান, গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঢাকায় ছোটবড় ১৮ টি ব্লাডব্যাংক সরেজমিনে দেখেন। চানখাঁর পূল, বাংলামোটর গ্রিন রোড, পান্থপথ, মিরপুর ইত্যাদি এলাকার ছোট দোকানগুলোর অবস্থা খারাপ। তিনি বলেন, বেশির ভাগই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে না। এদের রক্ত সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং সংরণ পদ্ধতিও ঠিক না। ব্যাগ নিম্নমানের। অনেক ক্ষেত্রে রক্ত সংগ্রহ ও মোয়াদোত্তীর্ণের তারিখও দেওয়া নেই। এ প্রতিবেদক ঢাকায় বাইরে কয়েকটি জেলা শহরে কিছু বেসরকারি ব্লাডব্যাংক দেখেছেন। বেশির ভাগই দাবি করেছে, তারা পাঁচটি পরীক্ষাই করে। তবে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, এনজিওর কর্মী ও স্থানীয় সাংবাদিকেরা এ ব্যাপারে সন্দেহ জানিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালগুলো বাইরের কিনিক থেকে রক্ত আসার কথা জানিয়েছে। তারা নিজেরা সে রক্ত পরীা করে নিচ্ছে কি? চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর হাসপাতালের ব্লাডব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন ব্লাডব্যাংক দুপুর আড়াইটা তিনটার বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় বাইরের কিনিক থেকে রক্ত আনলে এখানে পরীা করার উপায় থেকে না। রোগীর আত্নীয়দের রক্ত দিতে বলি। সবাই দেয় না। এখানে মাসে গড়-চাহিদা প্রায় ২০০ ব্যাগ। হাসপাতাল জোর ৪০ ব্যাগ রক্ত দিতে পারে।

কার রক্ত কী নিরাপত্তাঃ অভিযোগ আছে, অনেক সরকারি হাসপাতালের ব্লাডব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের সঙ্গে বেসরকারি রক্তকেন্দ্র ও পেশাদার বিক্রেতাদের যোগসাজশ আছে। ডা. মুরাদ জানান, ২০০০ সালে এসবিটিপি শুরুর সময় ৭০ শতাংশ রক্তই কিনতে হতো। এখন এটা ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে স্বেচ্ছায় দেওয়া রক্ত মোট জোগানের ২৬ শতাংশে উঠেছে। অন্যদিকে রোগীর আত্নীয়স্বজনের রক্ত। দেওয়ার হার চারগুণ বেড়ে ৬০ শতাংশ হয়েছে। তবে এই উৎসও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এ বছর ৯৮টি কেন্দ্রে প্রায় দেড় লাখের মতো নমুনা নিরীা করা হয়েছে। এর ৬৫ শতাংশ এসেছে রোগীর আত্নীয়দের কাছ থেকে। কিন্তু তার ছয়টি নমুনায় এইচআইভি পাওয়া গেছে। একজন স্বেচ্ছা-দাতার রক্তেও এইচআইভি পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক সময় পেশাদার দাতারাই হয়তো ছদ্মপরিচয়ে রক্ত দিচ্ছেন। এদিকে একাধিক সমীায় জানা যায়, সুইয়ের মাধ্যমে নেশাকারীদের অনেক রক্ত বিক্রি করে। ডা. সুলতান বলেন, সচেতন এবং দায়িত্বশীল স্বেচ্ছায় দাতা ছাড়া রক্তের যথেষ্ট জোগান ও প্রকৃত মান নিশ্চিত হবে না।

কেমন চলছে ৯৮ কেন্দ্র : রক্ত পরীক্ষার জন্য বছরে প্রায় তিন কোট টাকার রি-এজেন্ট ও অন্যান্য উপকরণ বাইরে থেকে এনে কেন্দ্রেগুলোকে সরবরাহ করে এসবিটিপি। কিন্তু সবসময় সময়মতো তা পোছানো যায় না। তখন কেন্দ্রগুলো স্থানীয় বাজার থেকে উপকরণ কিনে কাজ চালায়। জাতীয় এইডস কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেছেন সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা অনিশ্চিত। এসবিটিপি শুরু হয়েছিল জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থায়নে ২০০৩ সালেল ডিসেম্বরে সে চুক্তির মেয়াদ ফুরায়। বিশ্বব্যাংকের সহায়তা মেলে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ। মাঝে কয়েকমাস সব হাসপাতালে সমান কাজ হয়নি। ডা. মুরাদের মতে নিরাপদ রক্বত নিশ্চিত করার কাজটি রাজস্ বাজেটে অগ্রাধিকারভিত্তিতে যাওয়া দরকার স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাতে ২০১০ সাল অবধি সরকারের যে কার্যক্রম (এইচএনপিএসপি) এসবিটিপি তার অন্তর্ভূক্ত। তবে এটা এখনো দাতানির্ভর। এদিকে অভিযোগ আছে, এসবিটিপির সরবরাহ করা উপকরণ কেউ কেউ বাজারে বিক্রি করে দেয়। ডা. সুলতান বলেন এটা প্রমাণসাপেক্ষে তবে এ অভিযোগ একেবারে উডিয়েও দিতে পারচি না। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এইচআইভ বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) ডা. এ এস এম মতিউর রহমান বলছেন, যেহেতু উপকরণ দেওয়া হচ্ছে আশা তো করি যে পরীক্ষা তারা করে। ডা. ইসলাম জোর দিচ্ছেন নিবিড় নজরদারির ওপর আর ডাক্তার-কর্মীদের নিষ্ঠার ওপর। এসবিটিপি ৯৮টি কেন্দ্রে এ যাবৎ সাত লাখের মতো রক্ত-নমুনা পরীা করা হয়েছে। ৫২টিতে আওতায় সুযোগ না থাকায় এই ব্যক্তিদের এইচআইভি নিশ্চিতকরণ পরীা করার পরামর্শ বা কোন ব্যবস্থাপনা দেওয়া যায়নি। এরা হয়তো হারিয়েই গেছেন কিছু না জেনে-বুঝেই।

www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com