.
সিরিঞ্জের মাধ্যমে সংক্রামিত হচ্ছে
- মাহমুদা চৌধুরী / দিনকাল , ১৭-০২-০৭

চাঁনখার পুল পেরিয়ে আন্দবাজার ফুটাপাত সংলগ্ন ভাগারীর দোকানগুলোর সামনেই হরহামেশাই ওদের জটলা থাকে। ১৪ থেকে ১৫ বছরের এসব নারী পুরুষ। কখনো পরম বন্ধু। কখনো পরম শত্রু। মন-মেজাজ ভালো থাকলে দল বেঁধে বসে শিরায় মাদক নিয়ে বুধ হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন এলকায় বসত বাড়ি থাকলেও মাদকের নেশায় ওদের নিয়ে আসে এক মোহনায়। হিরোইন-গাঁজা দিয়ে শুরু। শেষ পরিনতি সুই সিরিঞ্জ দিয়ে শরীরের মাংস পেশী বা রক্তনালীতে মাদকের তরল নেয়া। সেগুনবাগিচা, হাইকোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, চাঁনখারপুল, আন্দবাজার বস্তি, ওসমানি উদ্যান, গুলিস্তান, স্টেডিয়ামজুড়ে ওদের দেখা যায়। নেশার বিষ শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে মরা মতো পড়ে থাকে ফুটপাতে, গাছতলা-মাঠে-ময়দানে।

Nasrob 2001 ২০০১ সালের দেশের ২৪টি জেলার মধ্যে ২০টি জেলায় ইনজিকটিং ড্রাগ ইউজার (IDU) দের উপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। তাতে দেখা যায়, শুধুমাত্র ঢাকা শহরে ২০ থেকে ৪০ হাজার নারী-পুরুষ সুই-সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক নিয়ে থাকে। জাতীয় এইডস/এসটিডি সিয়ন্ত্রন কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত আচরনগত সমীক্ষার ৪র্থ রাইন্ডে দেখা যায়, বাংলাদেশের মধ্যে এলাকায় ৭০ দশমিক ২ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারীরা সুই সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করে।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকার ও আন্তজাতিক সংস্থার আর্থ সহায়তার এইচআইভি/এইডস সংক্রমণ প্রতিরোধে ( সবচেয়ে জনগোষ্ঠী হিসাবে) ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারীদের মধ্যে তি হ্রাস পদ্ধতিতে বিনামূল্যে সুই-সিরিঞ্জ ও কনডম বিতরন করা হলেও ২০০৩ সাল থেকে এই এইজনগোষ্ঠীর মাধ্যে এইচআইভি সংক্রামনের হার বেড়ে এখন মহামারীর পর্যায়ে পৌছে গেছে।

বাংলাদেশে এইডস/যৌনবাহিত সংক্রমণ ব্যাধী (STD) পর্যবেণ রিপোট এর ৭ম রাউন্ড অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রামণের হার এক শতাংশে নিচে (শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ) রয়েছে। কিন্তু শিরায় মাদক গ্রহন কারীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ৭ শতাংশে পৌছে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুসারে ৫ শতাংশে পৌছানো মানেই মহামারী। ২০০৪ সালের এইআইভি পর্যবেণ রিপোর্টেই শিরায় মাদক গ্রহনকারীদের মধ্যে শতকরা ৪ দশমিক ৯ জনের মধ্যে এইচআভি ভাইরাস পাওয়া যায়। এছাড়া ৬০ শতাংশের রক্তে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস পাওয়া গেছে। প্রশঙ্গত ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমিত ১ জনকেন শনাক্ত করা হয়। ২০০৬ সালে ১ লা ডিসেম্বর পর্যন্ত এইচআইভি/এইডস সংক্রামিত ৮৪৭ জন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এদের মধ্যে ২৪০ জন ইতোমধ্যে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছেন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১০০৯ জন।

কেয়ার-এর এইচআইভি এইডস কর্মসূচির তথ্য কর্মকর্তা মঞ্জুর এলাহী জানান, প্রধানত তিন ধরনের ইনজেকশন ভাগাভাগির মাধ্যমে এইচআইভির বিস্তার হয়। প্রথমত মাদক গ্রহন করতে গিয়ে রক্ত সিরিঞ্জে ঢুকিয়ে তা গ্রহন করা হয় এবং পরবর্তীতে একটি সিরিঞ্জ অন্যেও সঙ্গে ভাগাভাগি করা। দ্বিতীয়ার হচ্ছে ফ্রন্ট-লোডিং অথবা ব্যাক লোডিং। যার মানে হচ্ছে এক সিরিঞ্জ থেকে অন্য সিরিঞ্জে মাদক ভাগাভাগি করা। তৃতীয়টি হচ্ছে মাদক গ্রহণের জন্য একাদিক মাদকসেবী একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়। কেয়ার জানায়, বাংলাদেশে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবীদের শতকরা ২৮ থেকে ৭৪ ভাগ প্রত বা পরোভাবে একে অপরের সুই ব্যবহার করে থাকে। সুই ভাগাভাগির বিষয়টি নেটওয়ার্কে পরিধির উপর নির্ভর করে।
কেয়ারের মতে মাদক ব্যবহারকারী ইনজেকশনের সাহায্যে যত বেশী ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবে, তত বেশি সংক্রমিত হওয়ার ঝঁকি বেড়ে যাবে।

প্রপ্ত তথ্য অনুসারে রাজাধানীর ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারীদের গড় বয়স তেত্রিশের কাছাকাছি। এদের মধ্যে ভাসমান মাদক ব্যবহারকারীদের ৪০ শতাংশের মত রিক্সা চালক। ২৫ শতাংশ মাদক বিক্রেতা বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এদেও ১০ শতাংশ আবার গৃহীন ফুটপাতের বাসিন্দা। তারা ময়লা আর্বজনা ঘেটে বিক্রিয় বা বিনিয়োগযোগ্য ভাঙ্গারী কুড়িয়ে বিক্রি করে। একটা অংশ ঠেলা বা রিক্সা চালক কিংবা কুলি-মজুর, ট্রাক ও নৌকাসহ পরিবহণ খাতে কর্মরত অনেকেই মাদকাসক্ত।

মাদকাসক্তরা এইচআইভি সংক্রমণের জন্য ঝঁকিপূর্ণ যেমন তেমনি সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঁঝা। মাদকসেবীদেও ৭০ শতাংশ জীবনে কমপক্ষে একবার জেলে গেছে বলে জানা যায়।

মাদকসেবীদের অনেকেই পকেটমার, চুরি কিংবা শরীরের রক্ত বিক্রি করে অর্থ আয় করে। খোঁজনিয়ে জানা যায়, রক্ত পরিসঞ্চালনের কাজে ব্যবহিত রক্তের একটি বড় অংশ আসে পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে। যাদের সিংহভাগই ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবনকারী।
জাতীয় এইডস/এটিডি কর্মসূচির ডা. সেলিম বলেন, বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার শতকরা এক ভাগের হলেও সংক্রমণের জন্য ঝঁকিপূর্ণ আচরণ ও পরিবেশ বাংলাদেশে রয়েছে, তার মতে বাংলাদেশে ভৌগোলিকভাবে ঝঁকির মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা, যৌন ব্যবসা, ঝঁকিপূণ জনগোষ্ঠী ও সাধারন মানুষের যোগসূ্ত্র, শ্রমিক অভিবাসন,জেন্ডার বৈষ্যম, দারিদ্র, শিক্ষার অনগ্রসরতা, যুব সমাজের মধ্যে নেশার আধিক্য, অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা, এইচআইভি/এইডম-বিষয়ে সচেতনার অভাব ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস এর জন্য খুবই ঝঁকিপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে।

এদিকে যুব সমাজের মধ্যে পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছরের তরুণদের মধ্যে গ্রামে বসবাসকারী ৪৮ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে বসবাসকারী ৪৫ শতাংশই ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সেই প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। বেশিভাগেরই এই বিবাহপূর্ব যৌন অভিজ্ঞতা শুরু তাদের মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ( ৫৮ শতাংশ) এবং তার পর যৌন কর্মীদের সাঙ্গে (২৬শতাংশ)। জরিপের তথ্যানুসারে শতকরা ৭ ভাগ বিবাহিত পুরুষের বিয়ের বাইরে যৌন সম্পর্ক রয়েছে। এদের মধ্যে এই জরিপ থেকে জানা যায়, তরুনদের মধ্যে যৌন রোগের প্রবণতা অনেক বেশি, জরিপ অনুসারে ২৫ শতাংশ তরুণ এবং ২১ শতাংশ তরুণী মধ্যে যৌন রোগ ল্যণ পাওয়া গেছে।

এদিকে ইউন এইডস এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য ২০০৪ সালের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে ১৫ হাজার থেকে ২৪ হাজার এইচআইভি পজিটিব রয়েছে। তবে সরকারী হিসাবে এইচআইভি পজিটিবের সংখ্যা ৭ হাজারের মত। এনএএসটিপি- এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা.সেলিম বলেন, সংখ্যা যাই হোক, অত্যন্ত জনবহুল এইদেশটি বাস্তবিক এইচআইভি এইড-এর ঝঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতিমধ্যে এইচআইভির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিরায় মাদক গ্রহনকারীদের এইচআইভি সংক্রমনের হার মহামারী আকারে পৌছেগেছে। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকার কোন অবকাশ নেই।
উল্লেখ্য, এইচআইভি/এইডস এর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসাবে পতিতাপল্লী, ভাসমান, হোটলভিত্তি নারী যৌন কর্মী, পুরুষ সমকামী, যৌনকর্মীদের বাঁধা খদ্দের বাবু, রিকশা-ট্রাক ঠেলা-লঞ্চচালকসহ পরিবহণ শ্রমিক ইত্যাদি।



www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com