সৎমায়ের অত্যাচারে সেই ছেলেবেলায় ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল কৃঞ্চা। এর পর পথে পথে কেটে গেছে ১৮ টি বসন্ত। ১২ বছর ধরে ও নেশা করছে, নেশার ঘোরে বেমালুম ভুলে গেছে জাত ধর্মের কথা। চানখার পুলে সবাই ওকে শাবানা বলে চেনে। ঘর বেধেছে এক মুসলামন মাদকসাক্তের সাঙ্গে। তার পরও সে আহার ও নেশার রশদ যোগড় করতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ জন খদ্দেরের কাছে দেহ বিক্রি করে। সে জানে এইচআইভি/এইডস কিভাবে হয়। প্রতিরোধ কিভাবে নিতে হয় সেটাও তার অজ্ঞাত নয়। কিন্তু নেশার ঘোরে নিরাপদ ব্যবস্থার কথা তার মনেই থাকেনা। চাঁনখার পুলে ১৫ জন নারী আইডিইউ (ইনজেকটিং ড্রাগ ইউজার) এবং ২০ জন নারী হেরোনসেবী রয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ পেশায় যৌনজীবি। শাবানা জানালেন সে দৈনিক চার বার ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নেয়। প্রত্যেকবার নতুন সিরিঞ্জ চেয়ে নেয় কেয়ারের আইটরিচ ওয়ার্কারের কাছ থেকে। কিন্তু কনডমের ব্যপারে ওর কোন আগ্রহ নেই। অথচ এ দুটো জিনিসিই বিনামূল্যে বিতরন করে আসছে কেয়ার। কেয়ার বাংলাদেশের ১৯৯৫ সাল থেকে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে কাজ করে আসছে। সরকারের জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির অধীনে বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও চট্রগ্রামে ৪১ টি ড্রাপ ইন সেন্টারের মাধ্যমে ২৭ হাজার ৩'শ ৮৭ জনকে নিরাপদ মাদক গ্রহন এবং নিরাপদ যৌন সেবা দিয়ে আসছে। এগুলোর মধ্যে ৩৩ টি সেন্টার কেয়ার চালায়। বাকিগুলো স্থানীয় এনজিওদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পদেপ নামে অপর একটি এনজিও খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহন কারীদের নিয়ে কাজ করছে। প্রসঙ্গত জাতীয় পরিসংখ্যান ২০০৫ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক ব্যবহার করছে।
জানা যায়, কেয়ার বাংলাদেশের এনএএসপি এর হ্যাপ (ঐঅঅচ) এর তহবিলের আওতায় রাস্তায় বসবাসকারী আইডিইউদের (তি হ্রাস পদ্ধতিতে) নিরাপদ মাদক গ্রহনের সহায়তা দিতে ২০০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। এদের অনেকেই এঙ্ আইডিইউ।
লন্ড স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রাপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের ২ জন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে এসে কেয়ারের আইডিইউদের নিয়ে কর্মকান্ডের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে বলেছে- বাংলাদেশে আইডিইউদের জন্য এই কর্মসূচি পরিচালনা করলে ২০০৬ সালে আইডিইউদের মধ্যে এইচআইভি সক্রমনের হার ৪২ শতাংশে পৌছা যেত। চাঁনখার পুল এলাকায় সরজমিনে ঘুরে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারীদের কাছ থেকে জানা গেল কেয়ার বিনামূল্যে সুঁচ সিরিঞ্জ সরবরাহ করা সত্ত্বেও মাঝে মাঝেই ওরা একটা সুঁচ সিরিঞ্জ দিয়ে চার পাঁচ জন মাদক নিয়ে থাকে। এদিকে দণি পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রাপ্ত অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দলের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে পারলে সাধারন মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ১ শতাংশের বেশি যেতে পারে না। দর্ুভাগ্যবশত ন্যাশনাল এইচআইভি এ্যান্ড বিহেবিওরাল সার্ভিলেন্স রিপোর্টে ঢাকায় ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকব্যবহারকারীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। যা অন্য কোন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় সবোর্চ্চ। ঢাকায় একটি এলাকায় এইচআইভি প্রাদূভাবের ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। যা ২০০৪ সালের মধ্যে মহামারীর সূচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এদিকে বাংলাদেশের বেশ ক'টি শহরে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারী পুরুষদের ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ গত বছর টাকার বিনিময়ে নারী দেহ ভোগ করেছে। এদের মধ্যে অনেকেরই নির্ধারিত সঙ্গী বা স্ত্রী রয়েছে যারা তাদের মাধ্যমে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চাঁনখার পুলের জুলি ৭ মাসের র্গভবতী। তারপরেও সে প্রতিদিন ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নিয়ে যাচ্ছে। ওর স্বমী জুয়েলেও মাদকাসক্ত। সুশ্রী ও কম বয়সী এই তরুণ চাঁনখার পুলে মাদক নিতে এসে জড়িয়ে পড়ে। জুলির সঙ্গে বিয়ে করার পরেও জুলিকে ঘরে তোলেনি ওর বাবা মা। তাই অভিমানে সে জুলির সঙ্গে রাস্তায় পেতেছে ঘর। কেয়ার বাংলাদেশের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে ১৪-৩০ বছর বয়সী তরুন-তরুণীদের মধ্যে মাদক ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। যত ব্যক্তি মাদক সেবন ত্যাগ করছে তার বেশি মাদকাসক্ত হয়েছে। মাদকমুক্ত হওয়ার পরে অনেকে ফের চলেসেছে মাদক সেবনে। কৃষ্ণা ওরফে শাবাণা ঢুলু-ঢুলু চোখে জানায়, মাদক রেহাই পেতে ও ৬ বার আহছানিয়া মিশন পরিচালিত লালবাগে মধুমিতা সেন্টারে চিকিৎসা নিয়েছে। সুস্থ হয়ে কাজ নেয় মধুমিতায় । ৮ মাস কাজ করার পর মধুমিতার এক নারী কর্মকতার কাছে চাকরির একটি সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য আবদার করে। শাবানার ভাষ্যানুসারে সেই নারী কর্মকর্তা তাকে বলেন, 'সার্টিফিকেট দিয়া কি করবা- স্বামীরে বেইচা খাওয়াইবা?' ব্যাস, এ কথাতে শাবানা আঘত পায় মনে। বলল, 'ওনার কথায় মনে বড় 'ট্যাশ' লাগল, তাই দু:খে চাকরি ছেড়ে ফের চইলা আইলাম পথে।' আবার সেই ইনজেকশন আর রাতের বেলায় দেহ বিক্রি। কেয়ার বাংলাদেশ এর তথ্য কর্মকর্তা মঞ্জুর এলাহী বলেন, আইডিইউরা অত্যন্ত সেনসেটিভ ও অভিমানী। ওদের সঙ্গে অত্যন্ত সর্তকভাবে কাজ করতে হয়। এজন্য কেয়ার কাউন্সিলিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে । কিন্তু সমস্যা হল, অনেক সময় ফান্ডের অভাবে কর্মসূচির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখন অভিজ্ঞকর্মীরা অন্য জায়গায় কাজ নিয়ে চলে যায়। পরর্বতীতে ফান্ড পেলেও নতুন করে সহমর্মী কর্মী তৈরি করতে অনেক সময় লেগে যায়। এদিকে পুরানকর্মীরা তাদের ব্যবহার দিয়ে আইডিউদের ঘনিষ্ট হয়েছিল ততটা নতুন দের প েসম্ভব হয়ে ওঠে না। কেয়ার ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারীদের সঙ্গে মানবাধিকার রা করে কাজ করছে বলে তিনি জানান। বলেন, পুরোপুরি মাদকমুক্ত করাটা খুবই ব্যয়বহুল ও সময়সাপে বলে 'তি হ্রাস পদ্ধতিতে বলা হচ্ছে' ড্রান নাও মানা করছি না, তবে নিরাপদ জনক ভাবে নাও।' তিনি জানান ইনজেকশন দিতে গিয়ে প্রায়শ আইডিইউদের শরীরে তির সৃষ্টি হয়। এসব তি যৌনবাহিত রোগ সংক্রমনের জন্য প্রচন্ড ঝুঁকি পূর্ণ। কিন্তু সরকারি মেডিকেলে গিয়ে এই হত দরিদ্র আইডিইউ যৌনকর্মীরা চিকিৎসা বা বিনামূল্যে ওষুধ পায় না।
কিন্তু সরকার হ্যাপ প্রকল্পের আওতায় ২০০০ সালের ৬ ডিসেম্বও থেকে কেয়ার ২৭ হাজার ৩০০'শ ৮৭ জনকে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকারীদের নিয়মিত স্বস্থ্য সেবা ও বিণামূল্যে ওষুধ দেয়ার পাশাপাশি সুঁচ ও সিরিঞ্জ এবং কনডম বিতরন করে আসছে। প্রকল্প চলবে আর মাত্র ১১ মাস। তারপর কি হবে? কেয়ারের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, এধরনের কর্মকান্ড থেমে গেলে আইডিইউরা ফের বিশৃংখল জীবনে ফিরে যায়। এতে এইচআইভি সংক্রমনের বিস্তার অনেগুন বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদেও মতে, বাংলাদেশের সীমান্ত লগ্ন ভারতের মণিপুর প্রদেশে কাঠমুন্ড ও রেঙ্গুনের মত এশিয়ার অন্যান্য শহরে এইচআইভি সংক্রমনের বিস্তার ঘটছে প্রথমত ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহনকাদের থেকে নারী যৌনকর্মী ও পরবর্তীতে তাদের খদ্দরের মধ্যে। তৃতীয় পর্যায়ে খদ্দেরের মাধ্যমে আক্রন্ত হচ্ছে পরিবার। শেষ পর্যন্ত সুবিশাল জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই জীবনঘাতী রোগটি।
|