.
ঢাকায় ৩৮০ এবং ময়মনসিংহ পতিতাপল্লীর ৩৩৫ নারীকে এইচআইভি প্রতিরোধী শিক্ষা দান।
- মাহমুদা চৌধুরী / দিনকাল , ২০-০২-০৭

'নষ্ট তো অইয়া গেছি। ভাল অমু ক্যান'? গতের বছরের মেয়েটির বুকের ভেতর বিষের হলাহল। বলল 'অনেক আশা ছিল ভাল হইয়া দেশে চইলা যামু'। কিন্তু দেখলাম 'ভাল অইলে মানুষ দাম দেয় না।'কমলপপুর বিশ্বরোড সংলগ্ন নারী মৈত্রীর ড্রপ-ইন সেন্টারে দেখা মেয়েটির সঙ্গে। বলল ' দেশে (গ্রামে) যাওয়ার জন্য ৯'শ টাকা জমাইছিলাম। চুন সোডা দিয়া হাত পোড়ায়া ঘাও বানাইলাম।কিন্তু সর্দারণী গালাকাটা রত্ন আমার টাকা তো দিলই না, উল্টো আমাকে চোর সাব্যস্ত কইরা আমার 'লম্বা চুলগুলান কাইটা দিল'। কথা বলতে বলতে মেয়েটির চোখে পানি এসে গেল। বলল ' টাকার চাইতে বেশি কষ্ট লাগতাছে চুলের ল্যাইগা। কি লম্বা চুল আছিল আমার..। এখন দেশে গেলে মানুষে কি কইব?' দশ-বার দিন হল, এই ড্রপ-ইন সেন্টারে এসেছে ও । আরও ১৫/১৬ জন মেয়ে রয়েছে এখানে। পূর্ব দিগন্তে আলো ফুটলেই ওরা চলে আসে এখানে। গোসল করে। রাঁধে, খায়, এরপর ট্যাবলেট খেয়ে লম্বা ঘুম। ওদিকে সাঝের আধাঁর নামলেই ওদের ঘুম ভাঙে।

সেজে গুজে প্রিন্টের সস্তা শাড়ি পরে খদ্দের খঁজতে পেত্নীর মত অন্ধকারে পথে ঘুরে বেড়ায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ফাতেমা ঘর থেকে পালিয়েছিল। অর্থের টানে মা পাড়ি দিয়েছিল সৌদিতে। বাবা বড় খালাকে বউ বানিয়ে ঘরে নিয়ে এল । ফাতেমার লেখাপড়ায় মন ছিল না কখনো । ভেবেছিল ঢাকা এসে গার্মেন্টসে কাজ নেবে। সেই বিশ্বাসে প্রতিবেশী খাল্লাম্মার হাত ধরে ঢাকায় এসেছিল। আসলে সে ছিল নারী ব্যবসায়ী। ভদ্র পাড়ায় বাড়ি বাড়ি ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে দেহ ব্যবসা চালাতো। বিষয়টি টের পেলে, সেদিন ওকেও নামতে বাধ্য করা হল আদিম এই পেশায়। পরিণতিতে রক্তাক্ত - ছিন্ন ভিন্ন অবস্থায় যেতে হল মেডিকেলে কাটিয়ে ফিরে এল একই বাড়িতে। ডাক্তার-পুলিশের পেছনে যে টাকা ঢালতে হয়েছিল খালাম্মাকে সেটা কড়াগন্ডায় ওকে, শোধ দিতে হল ওইটুকু শরীর বেঁচে। এভাবে ওর জীবন থেকে ঝড়ে গেছে দুইটি বছর। ততদিনে বুদ্ধি বেড়েছে। হিন্দি সিনেমার স্টাইলে এক খদ্দরকে 'ভাই' ডেকে ও বেরিয়ে এল অন্ধকারের সেই ঘেরটোপ থেকে। মধ্যারাতে লোকটি ওকে ফকিরাপুল এলাকায় ছেড়ে দিয়ে বলল 'পালা'।

ফাতেমার ভাষা হল 'লামু কই'। ঢাকার শহরতো চিনি না। কিছুন পরে চোখে পড়ল মেয়েদের ঘোরাফেরা । ওরা আমারে দেইখ্যা কেউ চুল ধইরা টানল। কেউ দিল চিমটি। কিল-ঘুষিও দিল কেউ কেউ। বলল ' ভাগ এইহান থন। আমাগো ভাত মারতে আইচস। তর অল্প বয়স দেখলে কেউ আমগো কাছে আইবো?'পরে ভাসমান যৌনকর্মী রত্না ওকে আশ্রয় দেয়। বিনিময়ে শরীর বেচে দিতে হত ঘর-ভাড়া-খাবারের টাকা।

মাত্র সতেরতেই ফাতেমা চিনেগেছে র্নিমম জগতটাকে । সন্তান জন্মদানের আগ পর্যন্ত ওকে শরীর বেচতে হয়েছে। কিন্তু ছেলেটি বাঁচেনি। 'বাউ-বাতাস লেগে মরেগেল, মাসখানের মধ্যে'। এই পেশার প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা থাকলেও ফেরার পথে বার বার বাঁধা সৃষ্টি করেছে ওর সর্দারণী ও অন্য সহকর্মীরা। চুরির দায়ে নিষ্ঠুরভাবে ওর চুল কেটে নিয়েছে। মারধর করেছে। পরে ভাসমান যৌনকর্মীদের সংগঠন দুর্জয়ে'র নেত্রী শাহানাজের কাছে বিচার দিয়েছেও। দশ-বার হল ও এসেছে নারী মৈত্রীর ড্রপ-ইন সেন্টারে।

১৯৯৬ সাল থেকে নারী মৈত্রী ইউএনডিপির এইচআইভি প্রতিরোধ কর্মসূচির আওতায় ভাসমান যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করা শুরু করে। ঢাকায় ৩৮০ জন নারী কে এইচআইভি/যৌনবাহিত সংক্রমিক রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা, চিকিৎসা এবং ভিত্তিমূলক প্রশিণ দিয়ে আসছে তারা। এখন HAPP- এর অর্থয়ানে চলছে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন। খুব শিগগিরই পর্যটন নগর কঙ্বাজারে এই কর্মসূচি সমপ্রসারণ করা হবে বলে জানালেন নারী মৈত্রীর প্রোগ্রাম অফিসের তাবাসুম আরা বেগম।

জানা যায়, নারী মৈত্রীর মুগদার ড্রপ-ইন সেন্টারে ৪০ জন যৌনকর্মীকে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। দিনের পুরোটা সময় ওরা ওখানে কাটায়। গোসল করে, কাপড় কাচে, রান্না করে। খায়-ঘুমায়। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস-এর ব্যাপকতা এখনো কম। এই দাবির ভিত্তিতে গত সাত বছর ধরে সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত নজরদারি চালু রেখেছে। (পেশাদার যৌনকমীর মত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর শিরায় মাদকগ্রহনকারী, যৌনরোগের চিকিৎসার জন্য কিনিকে আসা লোকজন, পুরুষ সহকামী এবং হিজরা।)

তিনি বলেন এই জরিপ অনুযায়ী দেশে এইডস রোগের ব্যপিকতা বেশি নয়। তবে এ জন্য আত্নতুষ্টির কারন নেই। কারণ ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে সাধারন মানুষের মধ্যে যৌনরোগের ব্যাপকতা অত্যন্ত বেশি। গভীর আশংকা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এসব যৌনরোগী এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা আক্রন্ত হলে এইচআইভি/এইডস আকস্মিকভাবে বন্যার মত ছড়াবে বলে ভয় রয়েছে।

নারী মৈত্রী সেন্টার ইন চর্াজ মনোয়ারা ইসলাম প্রায় এক দশক ধরে যৌনকর্মীদের আচার আচরণ ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন। এই সেন্টার থেকে যৌনকর্মীদের লেখাপড়া সহ দর্জিগিরি সেলাই, ব্লক-বাটিক, রান্না ইত্যাদি বৃত্তিমূলক প্রশিণ দেয়া হয়। এর পর গার্মেন্টসে তাদের কাজ জোগাড় করে দেয়া হয়। কর্মক্ষেত্রের যৌনকর্মীরা কি রকম কাজ করছে সেটাও নিয়মিত মনিটরিং করা হয় বলে তিনি জানান। যৌনকর্মীদের আচার-আচরণ সম্পর্ককে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মনোয়ারা বললেন, গামেন্টসে বেতন কম, পরিশ্রম বেশি বলে এসব মেয়ে ৪/৫ মাসের বেশি থাকেনা। ফের চলে আসে যৌন পেশায়। যৌন পেশায় কাঁচা টাকা বেশি। এটাই প্রধান কারণ। এছাড়া ওরা ভাল খাবার খেতে অব্যস। সেটা গামেন্টসের স্বল্প বেতনে সম্ভব নয়।

কিশোরী ফাতেমাকে বললাম, তুমি তো গাঁয়ে ফিরতে পারলেনা। ছেলেটাও মরে গেল। এর পর এই পেশায় থাকতে চাও নাকি গামেনর্টসে যাবে? প্রশ্ন শোনে ঠোঁট বাঁকায় ফাতেমা। বলল 'ইসরে, গামেন্টেসে যামু। গামেন্টস -এর কত মাইয়া আমাগো লগে কাম করে। ওরা কইছে- ওইখানেও মাইয়াগো খারাপ কইরা ফালায়'। কারা খরাপ করে প্রশ্ন করলে ফাতেমা হাসতে থাকে।

কথা প্রসঙ্গে ফাতেমা জানায়, ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে সে নিরাপত্তার জন্য সে কনডম ব্যবহার শুরু করেছে। তবে খদ্দেররা বুঝতে চায় না এর প্রয়োজনটা। বলল এখন আমি ওদেও ভয় দেখাই এই বলে যে আমার এইডস আছে। কিন্তু যখন ২ জনের কথা বলে ১২ জন কাম করে-সেই জানোয়াররা কি কথা শোনে?

হোটেল ভিত্তিক যৌন কমী পলি। সুশ্রী এবং লস্বাটে গড়েন। ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখা করেছে। এক বিদেশী বায়িং হাউজে কাজ করতো। ভালোবাসার প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশি মালিক তার সঙ্গে সমর্ম্পক গড়ে তোলে। কথাটা ওর স্বামী কানে গেলে পুত্র সন্তান সহ স্বামী ওকে তালাক দেয়। ঢাকার খুব কাছের একটি গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে বিদেশী মালিক ওকে চাকরিচু্যত করে নতুন মেয়ে নিয়োগ দিয়েছে।

নিজের ও ছেলের ভরণপোষনের জন্য গার্মেন্টসে কাজ নিল।কিন্তু যে টাকা পারিশ্রমিক মিলত তাতে পেটের ভাত জোটান কঠিন হয়ে দাঁড়াল। পরে পুরনো অফিসের এক পুরুষ সহকমীর সহায়তায় পলি হোটেলে যাতায়াত শুরু করল। এখন ওর ছেলে ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। কাসের ফাস্ট বয়। পুত্রের সাফল্যের গৌরবে গরীয়ান মা জীবন ব্যথার সব দুঃখ ভুলে গেছে।

সে জানাল, গার্মেন্টস এ কাজ করার কথা বলে সে প্রতিদিন ঢাকায় চলে আসে। সকাল ৯ টা থেকে রাত ৮ পর্যন্ত কাজ করে। হোটেলের খদ্দেরদের বেশির ভাগই এখন কনডম ব্যবহারে আপত্তি করে না বলে জানালে সে।

বাংলাদেশ ইনসিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এর গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে প্রায় ২২ লা শ্রমিক কাজ করছে। এদের ৯০ শতাংশ নারী শ্রমিক। আবার এদের দুই-তৃতীয়াংশ গ্রামীণ ভূমিহীন পরিবারের সদস্য।



www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com