.
বিক্রমপুরের বীণার জীবনে বিড়ম্বনা যেখানে পা বাড়ায় সেখানেই নিগ্রহ
- মাহমুদা চৌধুরী / দিনকাল ,১৮-০৫-০৭

বীনার (ছদ্মনাম) বয়স এখন মাত্র তেইশ। ১ বছর ৩ মাস আগে এইডস রোগে ওর স্বামী মারা গেছেন। ওর স্বামী বিয়ের আগে থেকেই মালয়েশিয়া কাজ করতেন। বিয়ের পর মাঝখানে দুএকবার দেশে এসেছেন। কিন্ত শেষবার অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে মিয়নমারে আটক থাকতে থাকতে হয় ১৪ মাস। সেখানে পাইলস এর সমস্যা হয়। দেশে ফিরে মীরপুরে এক প্রাভেট কিনিকে অপারেশনের পর বছর খানেক ভাল ছিলেন। শেষে ২০০৬ সালের ১৯ মার্চে মারা যান তিনি।

ঢাকার খুব কাছে বিক্রমপুর এলাকার অল্প-শিতি অতি সাধারণ মেয়ের স্বল্প সময়ের দাম্পত্য জীবনের আলেখ্য স্বামীর মৃতু্যর মধ্য দিযে সমাপ্ত ঘটলেও এইডস রোগীর স্ত্রী হওয়ার অপরাধের খেসারত প্রতিনিয়ত দিতে হচ্ছে। স্বামীর মৃতু্যর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত গায়ের এই সরল সহজ বধুটি জানতো না তার স্বামী এইডস রোগে আক্রান্ত হয়েছে। স্বামীর মৃতু্যর পর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ওর পরনের সমস্ত কাপড় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। থালা-বাটি, গেলাস আলাদা করে দেয় । রাত যাপনের জায়গা নির্ধারিত হয় পাকের ঘরে।

পারিবারিক নিগ্রহের পাশাপাশি শুরু হয় সামাজিক নিগ্রহ। বাবার এইডস হওয়ার ঘটনা গ্রামে জানাজানি হওয়ায় ৭ বছরের ছোট্র ছেলেটিকে (এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণ মুক্ত সে) গাঁয়ের স্কুল থেকে 'টিসি' (TC) দিয়ে দেয়া হয়। পাশের গ্রাম বেলতলীর একটি স্কুলে অনেক বলেকয়ে বীণা ছেলেকে ভর্তি করায়। কিন্তু তাকে শর্ত দেয়া হয় এই বলে যে, তার ছেলের নাম কাসে ডাকা হবে না । এদিকে বীনার রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেছে , স্বামীর মরণ ব্যধীর বীজ বীনার দেহেও অংকুরিত হয়েছে । তবে শিশুপুত্র এইচআইভি ভাইরাস মুক্ত এটুকু ওর একমাত্র সান্তনা।

এইচআইভি পজেটিভদের সংগঠন আশার আলো প্রতিষ্ঠানে দেখা হল বীনার সঙ্গে। মা ও ছেলে দু জনেই প্রচন্ড অপুষ্টিতে ভুগছে। বীনা জানাল, শ্বশুরবাড়ির লোকদের অপমান আর আনাদও সইতে না পেরে বাপের বাড়ি চলে এসেছে। কিন্তু এখনেও লঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে ভাই ও ভাবীর হাতে। ভাবী বলেছে তোমার বোন এখানে থাকলে আমার ছেলে-মেয়েরাও এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। ভাবীর কথা শুনে ভাই বলেছে, শ্বশুরবাড়িতে চলে যা। তোর ভাবী পছন্দ করছে না । অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে আকুল বীনা বলল, কোথায় যাব, কী করব, ছেলেটিকে কিভাবে লেখাপড়া করাব, ভেবে পাই না। মাঝে মাঝে মনে হয় আত্নহত্যা করি। পরে ছেলের কথা ভেবে মরতে পারি না । চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, আমি মরে গেলে ওকে দেখ-শোনা করার কেউ থাকবে না। দু-তিন মাস হলও আশার আলোতে আসা যাওয়ার করছে। সংগঠনের প থেকে ওর পুষ্টিমান ঠিক রাখা সহ যাবতীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু বীনার কথা হল, যদি একটা কাজ মিলতো তা হলে ছেলে কে নিয়ে আত্নসম্মান নিয়ে বেচে থাকতে পারতাম। কিন্তু এই সমাজে মানবদরদী এমন কে আছে- যে জেনেশুনে, এইচআইভি ভাইরাস পজিটিভ স্বল্প শিতি দুঃস্থ এই নারীকে কাজ করার সুযোগ দিয়ে দুটি নিষ্পাপ জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসবে?

বীনার মতে এইচআইভি/এইডস নিয়ে আরো বেশি প্রচারণা হওয়া উচিত। বিজ্ঞাপনের ভাষা আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার। সেই সঙ্গে এইডম সমর্্পকে ভুলধরনা দূর করতে হলে 'বিটিভি'-এর মাধ্যমে করতে হবে। বীনা বলল, বিটিভি শহর-গ্রাম-গঞ্জের সবাই দেখতে পারে। অন্য চ্যানেলগুলোতে সেই সুবিধা নেই। আশার আলো সংন্থা পরিচালক হাবিবা আখতারের মতে 'এইডস' রোগ সংক্রান্ত প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনগুলো অগভীর। ভাসা ভাসা ভাবে ভয়াবহ এই রোগ সম্পর্কে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গণমাধ্যমে এইডস সম্পর্কে সঠিক তথ্য পরিষ্কার করে বলতে হবে। তিনি বলেন, গত ১৭ বছর পরে বলা হচ্ছে ' বাঁচতে হলে জানতে, জানতে এবে' এবং এটুকু বলেই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে 'কানে হাত/চোখে হাত' এগুলো নেতিবাচক ভাবে সাধারন মানুষকে প্রভাবিত করবে বলে আশাংকা করা হচ্ছে।

এইচআইভি পজিটিভ বীনা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে বলল, টিভিতে এই বিজ্ঞাপন দেখেছি। কিন্তু এই রোগের ব্যপকতা সম্পর্কে কিছু বুঝিনি। আমার ভাবী বলেন, এইডস একজন থেকে ১০ জনের হয়। আপনি শ্বশুর বাড়ি চলে যান। কিন্তু এইডসের বিজ্ঞাপনে আরো স্পষ্ট কথার্বাতা থাকলে আমাকে ভাবীর গঞ্জনা সইতে হতোনা। এইচ আইভি পজিটিভদের চিকিৎসা সেবা দেন ডা. হালিদা হানুম খন্দকার। কনফিডেন্টশিয়াল এপ্রোচ টু এইডস প্রিভেনশন (CAAP) নামক একটি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বনানীতে ৫ শয্যার একটি হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন অসহায় এইডস রোগীদেও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার ল্যে। 'ক্যাপ' থেকে র্বতমানে ৫৭ জন এইচআইভি এইডস রোগীকে 'এআরভি' (ARV) ড্রাগ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে ১৩ জন নারী। সবাই গৃহবধু এবং স্বামীর মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন।

ডা. হালিদা হানুম খন্দকারও গনমাধ্যমে এইচআইভি /এইডস সম্পকিত বিজ্ঞাপনগুলোর সমালোচনা করেন। তার মতে এইডস এর বিজ্ঞাপনী ভাষা অত্যন্ত নোংরা। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনীর মাধ্যমে অবৈধ যৌনতায় উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, টিভি ঘরে বসে এক সঙ্গে সবাই দেখেন। সেখানে 'যৌনর্কম' জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা বিকৃতিকর। সে ক্ষেত্রের 'সহবাস' বা 'শারীরিক সম্পর্ক' ইত্যাদি বলা যেতে পারে। প্রসঙ্গত গত দু'দশক ধরে বাংলাদেশে এইডস প্রতিরোধ সচেতনতামূলক কাজ চলছে। ইমাম সহ সব ধর্মীও নেতাকেও এইডস সম্পর্কেক সাধারন মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইমামদের প্রশিণের পেছনে এপর্যন্ত লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু সরকারী গবেষণায় দেখাগেছে, দেশের মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ এইডস প্রতিরোধের সকল উপায় সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত।




www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com