.
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
-মাহফুজা জেসমিন

আজ ২৪ মার্চ । বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। এবারের যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য , 'যক্ষ্মা সবখানে-প্রতিরোধ একসাথে'। অর্থ্যাৎ যক্ষ্মাকে প্রতিরোধ করতে হবে সবাই মিলে। তাই জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে জনঅংশগ্রহণ এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। জনঅংশগ্রহণের কথাই উঠে এসেছে এসব বিভিন্ন পেশাজীবী সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে।

মুসলিমপুর গ্রামের বদর বেপারী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন যৌবনের শেষার্ধে এসে। তারপর পুরো বার্ধক্য কাটিয়েছেন যক্ষ্মা'র সঙ্গে। যক্ষ্মার ঔষধ খেয়ে। সবার ছোঁয়া বাঁচিয়ে। তিনি এভাবেই বেঁচে ছিলেন প্রায় কুড়ি বছর। বলা হতো, এ রাজ রোগ। তার উত্তরাধিকারও রেহাই পাবে না এ থেকে। সত্যিই রেহাই পায়নি তার একমাত্র পুত্র সন্তান। বদর বেপারী না জেনে ভুল ঔষধ আর অনিয়মিত চিকিৎসায় কষ্ট করে গেলেন। উত্তরাধিকারসুত্রে তার পুত্রও হলেন টিবি রোগী। কোন ঔষধেই যার আর রেহাই মেলেনি । জীবনকালে পাঁচটি সন্তানের পিতা হয়েছেন বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে আনন্দের সময় কাটাতে পারেন নি। একই পরিবারের তৃতীয় জন আক্রান্ত হয়েছিল যক্ষ্মায়। বদর বেপারী'র নাতনি। প্রাথমিক অবস্থায় যক্ষ্মা সনাক্ত হওয়ায় এবং নিয়মিত চকিৎসায় ভালো হন তিনি। গাজীপুরের দিঘীরচালা গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ মো: ছবেদ আলী, মোসা: লাকী আক্তার সুস্থ হয়েছেন স্বাস্থ্যসেবিকার হাতে নিয়মিত ঔষধ খেয়ে । আবার বার বইকা গ্রামের মাহবুবা স্বাস্থ্য সেবিকার হাতে নিয়মিত ঔষধ খাওয়ার জন্যই স্বামীর বাড়ি থেকে চলে এসেছেন বাপের বাড়ি। রিক্সাচালক নেয়ামত টিভিতে রিয়াজের বিজ্ঞাপন দেখেছেন। যক্ষ্মা রোগ ভালো হয়-একথা জানেন। কিন্তু এর চিকিৎসা কোথায় হয় তা জানেন না। ভ্যানচালক মো: মজিব যক্ষ্মা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন,, 'যক্ষ্মা রোগ তো মরণ রোগ। একবার হইলে রক্ষ্মা নাই। শুনলেই ভয় করে।' গার্মেন্টস কর্মী ছাহেরা নিজেই যক্ষ্মা রোগী। পাঁচ মাস ধরে ঔষধ খাচ্ছেন। ছাহেরা জানালেন, যক্ষ্মা ভালো হবে এটা জেনেও তার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে তার কাছ থেকে দূরে থাকে। কিন্ত স্কুল ছাত্রী তানজিরা, স্মরণা, কিশোর ইব্রাহিমের মত অনেকেই যক্ষ্মা রোগের নাম ছাড়া কিছুই জানেন না। গাজীপুরের বারবইকা গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী স্মরণা, যক্ষ্মা রোগের নাম টিভিতে শুনলেও এ সম্পর্কে তেমন কোন ধারনা নেই তার। ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী তানজিরা কামাল জানান, যক্ষ্মার অপর নাম টিবি এবং ছয়টি বাধ্যতামূলক টিকার মধ্যে যক্ষ্মার টিকাও দেয়া হয়। গৃহবধু ফাহমিদা খান দৈনিক পত্রিকার স্বাস্থ্য পাতা পড়ে জেনেছেন থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েবিনামূল্যে যক্ষ্মার চিকিৎসা পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি মনে করেন, যক্ষ্মা রোগীর ডিম দুধ, কবুতরের মাংস ইত্যাদি ভালো ভালো খাবার খেতে হয়।

১৯৯৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মাকে বিশ্ব জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পৃথিবীতে যক্ষ্মাপ্রবণ ২২ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে ৬ষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবছর এ দেশে হাজার হাজার লোক যক্ষ্মায় মারা যায়। আক্রান্ত হয় লাখ লাখ। কিন্তু এই মৃতু্যর জন্য দায়ী কেবল যক্ষ্মা জীবাণু নয়। দায়ী মানুষও। কেননা যিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন, তিনি জানেন না, যে তার একটু অবহেলা আরো দশ জনের জীবন বিপন্ন করছে। কিংবা তিনি জানেনই না যে, নিয়মিত ও পূর্ণমেয়াদের চিকিৎসায় যক্ষ্মা ভালো হয়। কেউ আবার লোক লজ্জার ভয়ে রোগের কথা স্বীকারই করেন না। কেউ বা নিরবে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে এখন জনঅংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সহশ্রাব্দ উন্নয়ন ল্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা এবং যক্ষ্মার কারণে মৃতু্যর হার অর্ধেকে কমিয়ে আনার ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন সহশ্রাব্দের উন্নয়ন ল্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা: ভিকারুন্নেছা বেগম বলেন, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হলে স্বাস্থ্য সেবার মান বাড়াতে হবে। রোগীরা যদি সুচিকিৎসা ও সুপরামর্শ পায় তারাই একে অপরকে সচেতন করে তুলবে। তিনি মনে করেন, দারিদ্র্য দেশের স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। তিনি বলেন, দেশ থেকে আগে দারিদ্র্য কমাতে হবে। দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্ত হলে মানুষ শিতি ও কুসংস্কারমুক্ত হবে। তখন মানুষ আপনা থেকেই স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা'র ন্যাশনাল কনসালটেন্ট ডা: খুরশীদ আলম হায়দার বলেন,' যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র সার্বিক সাফল্য অর্জন করতে উন্নত স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় প্রতিনিধি ও গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে পাড়া, মহল্লা, গ্রাম, থানা, জেলা প্রতিটি পর্যায়ে উদ্বুদ্ধকরণ সভার আয়োজন করতে হবে। কমিউনিটি সচেতন হলে দেশের সার্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

ব্র্যাক এডভোকেসি এ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ইউনিটের পরিচালক আফসান চৌধুরী বলেন, মানুষকে বুঝতে হবে যে, যক্ষ্মা একটি মারাত্মক রোগ এবং এটি চিকিৎসায় ভালো হয়। তাকে জানতে হবে যক্ষ্মার চিকিৎসা তার হাতের কাছেই। এটি পাওয়া তার অধিকার। তিনি মনে করেন, এটা যদি জনগণের বিষয় হয়, তাহলে জবাবদিহিতামূলক পরিবেশে জনগণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নত মান দাবী করতে পারে। অর্থ্যাৎ চিকিৎসক ভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চেয়ে সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনেক সবল। এই উদাহরণ এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে।
www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com