ঢাকার মিরপুর এলাকায় বেড়িবাঁধের পাশে বস্তির ঘুপচিঘরে দুপুর ১২টায় ঘুমাচ্ছিলেন রহিমা বেগম। ডাকাডাকিতে তাঁর ঘুম ভাঙে। সারা রাত বালুর ট্রাকে কাজ করেছেন। আগে দিনেও কাজ করতেন কিন্তু এখন আর পারেন না। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন।
কথায় কথায় রহিমা জানান, বছর দু-তিন আগে একবার যক্ষ্মা হয়েছিল তাঁর। ওষুধে ভালোও হয়ে যান। কিন্তু গত বছর আবার টানা চার-পাঁচ মাস কাশি এবং জ্বরে ভোগেন। পরীক্ষায় আবারও তাঁর যক্ষ্মা ধরা পড়ে।
রহিমার ছোট্ট ঘরে আলো-বাতাস ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। আগে তিনি মিরপুরেরই আরেকটি বস্তিতে থাকতেন। সম্প্রতি সরকার সে বস্তি ভেঙে দিয়েছে। এই জায়গায় তাঁকে ঘরের ভাড়া দিতে হচ্ছে মাসে ৮০০ টাকা।
রহিমার হয়েছে রাজরোগ। ভালো হতে হলে ভালোমন্দ খেতে হবে। এর পেছনেই চলে যাচ্ছে তাঁর আয়ের একটি বড় অংশ। রহিমা বলেন, 'শইলে সুঁই (ইঞ্জেকশন) দিয়াই কামে যাইতে হইছে। কাম না করলে খামু কী?'
প্রায় তিন মাস হয় রহিমা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ব্র্যাকের মাধ্যমে যক্ষ্মার ওষুধ পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তাঁর আবার যক্ষ্মা হওয়ার কারণ হয়তো অপুষ্টি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আবার এমনো হতে পারে প্রথমবার তিনি পুরোপুরি সেরে ওঠেননি।
বাংলাদেশে যাঁরা যক্ষ্মায় ভোগেন তাঁদের বড় অংশটিই রহিমার মতো, অতি দরিদ্র। আবার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যক্রম দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
আজকাল দুনিয়াজুড়ে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত ও কার্যকর পদ্ধতিটির নাম সংক্ষেপে ডটস্ (ডিরেক্টলি অবজারভড ট্রিটমেন্ট শর্ট কোর্স)। এই ব্যবস্থায় রোগীর ওষুধ খাওয়ার সরাসরি নজরদারি করা হয়। ২০০২ সালে সরকারের 'যক্ষ্মা ও দারিদ্র্য' শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ডটসকেন্দ্রগুলোয় আসা রোগীদের ৭০ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।
আবার যক্ষ্মা মোকাবিলা করতে গিয়েও নতুন করে ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। বাংলাদেশে যক্ষ্মা আক্রান্তদের ৯০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। যক্ষ্মা এঁদের জীবিকাও ব্যাহত করে।
দরিদ্ররা বেশি ঝুঁকিতে: বেসরকারি সংস্থা নগর গবেষণাকেন্দ্রের (সিইউএস) হিসাব অনুযায়ী রাজধানীসহ দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৫৪ লাখ। ঢাকা মহানগর এলাকায় মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ অর্থাৎ ৩৪ লাখেরও বেশি লোক বস্তিতে থাকেন। যক্ষ্মার ঝুঁকি তাঁদের অনেক।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. কে জামান বলেন, দরিদ্ররা বেশি অপুষ্টিতে ভোগে। তাদের মধ্যে শিার হার কম এবং তারা মানবেতর পরিবেশে একই ঘরে বা একই জায়গায় ঘেঁষাঘেঁষি করে অনেক লোক থাকে। ফলে বাতাসের মাধ্যমে এ রোগের জীবাণু সহজেই অন্যজনকে সংক্রমিত করে।
ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত ব্যক্তি বিনা চিকিৎসায় থাকলে তাঁর হাঁচি-কাশি-থুথু থেকে যক্ষ্মার জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা বলছেন, দরিদ্রদের মধ্যে যক্ষ্মা দেরিতে শনাক্ত হওয়াও একটি সমস্যা।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ফটকের কাছে এনজিও ব্র্যাকের অফিসে বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা করা হয় এবং যক্ষ্মা রোগের ওষুধ দেওয়া হয়। এখানকার কার্যক্রম পরিচালনা করেন আবদুল্লাহ। তিনি জানান, কফ পরীা করতে হয় তিনবার। কেন্দ্রে আসতে হয় আবার বাড়িতে পাত্র নিয়ে গিয়ে কফ আনতে হয়। রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত আসা-যাওয়ায় প্রায় দুই-তিন দিন লেগে যায়। ফলে অনেকেই কফ পরীার পাত্র নিয়ে গেলেও পরে আর আসেন না।
মোকাবিলা কার্যক্রমে দরিদ্ররা অবহেলিত: আন্তর্জাতিক দাতামোর্চা গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস, টিউবারকিউলসিস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া (জিএফএটিএম) থেকে পাওয়া ৬৩০ কোটি টাকায় (২০০৪-২০১১) দেশে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরাই বলছেন, এ কর্মসূচিতে অতিদরিদ্রদের জন্য নিবিড় কার্যক্রম নেই।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ল্য, কফে যক্ষ্মা জীবাণুযুক্ত রোগীর ৭০ শতাংশ শনাক্ত করা এবং তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৮৫ শতাংশ রোগীকে ভালো করা। এ সাফল্যকে অব্যাহত রাখাও অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ছাড়া ২০১৫ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের চেয়ে তুলনায় যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা এবং যক্ষ্মার কারণে মৃতু্য অর্ধেকে কমিয়ে আনাও উদ্দেশ্য। সরকার দাবি করছে, শনাক্তকরণ এবং সুস্থ করার ক্ষেত্রে এ কর্মসূচি সফল হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে ব্র্যাকসহ মোট ২৮টি এনজিও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে ব্র্যাক। ঢাকা শহরের আশপাশের এলাকায় ব্র্যাক ১৮টি ডটসকেন্দ্র চালায়। ২০০৬ সালে এই কেন্দ্রগুলো মোট তিন হাজার ৫৭৮ জন যক্ষ্মা রোগী পায়।
এদের মধ্যে বস্তিবাসী অতিদরিদ্র যক্ষ্মা রোগী আছেন মাত্র ২৫২ জন। রোগীদের মধ্যে বাবুর্চি, দিনমজুর, সবজি বিক্রেতা, বিভিন্ন গাড়িচালক, রিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ আছে। ব্র্যাকের কেন্দ্রে বেশি এসেছেন পোশাক শ্রমিক এবং বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবি্লউএইচও) যক্ষ্মা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক পরামর্শক ড. খুরশীদ আলম হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, এ কর্মসূচি এখনো বস্তি, কারখানা বা পোশাক শ্রমিকদের দিকে পুরোপুরি সন্তোষজনকভাবে নজর দিতে পারেনি। তাঁর মতে, এ বিষয়টি কর্মসূচির সাফল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
ডবি্লউএইচও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। ড. খুরশীদ বলছেন, জাতীয় কর্মসূচির কর্মকৌশল পরিকল্পনাতেও সরাসরি বস্তি এলাকা অন্তভর্ুক্ত হয়নি। ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির ব্যবস্থাপক ড. আকরামুল ইসলামও বলছেন, বিভিন্নভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম চালালেও এখনো সবার কাছে তা পৌছায়নি।
সমস্যা ওষুধ খাওয়া নিয়েও: মিরপুর বেড়িবাঁধের বস্তিতে থাকেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকা দুলু বেগম। তিনি এখানকার যক্ষ্মা রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খাওয়ান। নিয়ম হচ্ছে রোগীরা স্বাস্থ্যসেবিকার বাড়িতে গিয়ে তাঁর সামনে ওষুধ খাবেন।
কিন্তু দুলু বেগম বলেন, তাঁর নিজের ছেলের যখন যক্ষ্মা হয় ওষুধ খাওয়ার বিঘ্নগুলো স্পষ্ট বুঝতে পারেন তিনি। তাঁর ছেলে একটি হোটেলে কাজ করে এবং সেখানেই থাকে। বাড়িতে এসে ওষুধ খাওয়া খরচসাপে। আবার হোটেলে জানাজানি হয়ে গেলে চাকরিও চলে যাবে। তাই নিজে সামনে বসে খাওয়ানো আর হতো না।
শ্যামলীতে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ডটসকেন্দ্রে এ প্রতিবেদক দেখতে পান, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ বছর মোট ৩৪ জন রোগীর নাম অন্তভর্ুক্ত হয়েছে। তাঁদের প্রতিদিন ডটসকেন্দ্রে এসে ওষুধ খাওয়ার কথা। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র নয়জন ওষুধ খাওয়ার জন্য আসেন। কর্তব্যরতরা জানান, আগের দিন এসেছিলেন ১৫ জন। শ্রমজীবী দরিদ্রদের নিয়মিত গিয়ে ওষুধ খাওয়া কঠিন।
যক্ষ্মা হলে কোথায় যেতে হবে সেটাও অনেক দরিদ্র মানুষ জানে না। ফলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়। তাতে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে। মোহাম্মদপুরের আদাবরের এক বস্তির রিকশাচালক আব্দুর রহিম বলেন, 'ভাইয়ের অনেক দিন কাশি ছিল। মহাখালী হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, এলাকার একজন চিকিৎসকসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেই প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করি। পরে শ্যামলীর যক্ষ্মা হাসপাতালে যাই।'
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ব্যবস্থাপক (প্রোগ্রাম ম্যানেজার) ডা. ভিকারুন্নেছা বেগমের মতে, সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম থাকলেও দরিদ্র শ্রেণী যক্ষ্মা সম্পর্কে খুব একটা সচেতন হয়ে ওঠেনি। তিনি আরও বলেন, দরিদ্র রোগীরা ভালোমন্দ খেতে গিয়ে অনেক খরচ করেন। কিন্তু রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত খাবার খাওয়াই যথেষ্ট।
|