.
নারীর যক্ষ্মা শনাক্ত হচ্ছে কম, চিকিৎসার সুযোগও কম
- মানসুরা হোসাইন / প্রথম আলো, ৫ জুন ২০০৭

শিবানী রানী শুকিয়ে বিছানার সঙ্গে মিশে গেছেন। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার জলছত্র হাসপাতালে সপ্তাহ তিনেক আগে ভর্তি হওয়া শিবানী একটু কথা বলতেই হাঁফিয়ে ওঠেন। তাঁর যক্ষ্মা হয়েছে। তবে সেটা ধরা পড়তে পড়তে রোগ অনেকদূর গড়িয়ে গেছে।
জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলায় বাবার বাড়ি থেকে শিবানীকে তাঁর ভাই নিয়ে এসেছেন জলছত্রের কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা চিকিৎসার হাসপাতালটিতে।

আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে যক্ষ্মা কম শনাক্ত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, নারীদের ঘোরাঘুরির গণ্ডি ছোট হওয়ায় তাদের যক্ষ্মা সংক্রমণের ঝুঁকি ও হার কম। তবে অনেকেই মনে করেন, নারীর অসুখ-বিসুখ এমনিতেই কম গুরুত্ব পায়। রোগ পরীক্ষা করানোতেও পরিবারের অবহেলা থাকে। আর নারী নিজেও যক্ষ্মার লণ বুঝলেও সামাজিক প্রতিক্রিয়া-গঞ্জনার ভয়ে কাউকে জানাতে চায় না।

নারীর যক্ষ্মা কম ধরা পড়ে:

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০০৫ সালে নতুন করে ৫৭ হাজার ৪২০ জন পুরুষের ফুসফুসের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। সে বছর এ ধরনের যক্ষ্মায় নতুন শনাক্ত নারীর সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ২৮২ জন।

নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে ব্র্যাকসহ মোট ২৮টি এনজিও। এদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক কাজ ব্র্যাকের। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ফুসফুসের এবং অন্যান্য যক্ষ্মা মিলিয়ে মোট ৫৬ হাজার ৫৮৩ জন পুরুষ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়। কিন্তু নারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ হাজার ৪৯৫ জন।

জাতীয় বব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, নারীরা যক্ষ্মায় কম আক্রান্ত হবেন এমন কোনো কথা নেই। তিনি জানান, অনেক অভিভাবক আগে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেন, পরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসেন। তিনি দেখেছেন, বিয়ের পরও অনেকে সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয়ে এ অসুখের কথা গোপন করার চেষ্টা করে চলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা নারী-পুরুষভেদে যক্ষ্মার প্রবণতা বিষয়ে বাংলাদেশ, ভারত, আফ্রিকার মালাউই ও দণি আমেরিকার কলম্বিয়ায় একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। গত বছর প্রকাশিত এ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের নারীরা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টিকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়। নারীরা প্রথমে অসুখের কথা গোপন করে। পরে তারা কবিরাজ, হাতুড়ে চিকিৎসক সব পার করে যায় পেশাদার চিকিৎসকের কাছে। তবে এ গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসার আওতায় এলে যক্ষ্মা আক্রান্ত পুরুষদের তুলনায় নারীরা তাড়াতাড়ি ভালো হন।

বাংলাদেশ থেকে এ গবেষণায় অংশ নেয় ব্র্যাক। সমীাটিতে দেখা যায়, যক্ষ্মা আক্রান্ত শতকরা ৬৯ জন পুরুষ বেসরকারি চিকিৎসক বা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যায়। পান্তরে নারীদের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার হার ৫২ শতাংশ। পুরুষদের চেয়ে নারীদের মধ্যে তালাকপ্রাপ্তের সংখ্যাও অনেক বেশি।

যক্ষ্মা হলে নারীর চিকিৎসা:

নারী-পুরুষভেদে টিবি নিয়ন্ত্রণের সমস্যা বিষয়ে ব্র্যাকের ২০০৩ সালের একটি প্রকাশনা আছে। এতে দেখা যায়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে এ দেশে পুরুষের চেয়ে কমসংখ্যক নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যক্ষ্মার লণের কথা জানায়, কফ পরীা করায় বা শনাক্ত হয়।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির ব্যবস্থাপক ড. আকরামুল ইসলাম বলেন, নারীর হাতে টাকা কম থাকায় এবং তাদের একা চলাফেরায় বাধা থাকায় নারীর যক্ষ্মা রোগীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারাও একটা সমস্যা। তাকে যেতে হয় পরিবারের পুরুষটির খরচে, পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে। অনেক সময় পরিবারই নারীর চিকিৎসার ব্যাপারে আগ্রহী হয় না।

আবার যক্ষ্মা আক্রান্ত মাকে তাঁর সন্তানের দেখাশোনা চালিয়ে যেতে হয়। এনজিও ডেমিয়েন ফাউন্ডেশন পরিচালিত জলছত্র হাসপাতালে শিবানীর সঙ্গে তাঁর আট বছরের মেয়েটিও আছে। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাড্ডিসার রোগা মেয়েটিও কাশছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন, মায়ের সঙ্গে থাকার ফলে মেয়েটিরও যক্ষ্মা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার অনন্তপুর গ্রামে একই এনজিও পরিচালিত যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ হাসপাতালে কথা হয় ১৭ বছর বয়সী বিউটি আক্তারের মায়ের সঙ্গে। তিনি দেখভালের জন্য মেয়ের সঙ্গে এ হাসপাতালে থাকছেন। বিউটিকে থাকতে হবে দীর্ঘ নয় মাস। তার ওষুধ-প্রতিরোধী বা এমডিআর যক্ষ্মা হওয়ায় সেরে উঠতে সময় নেবে। চিকিৎসকেরা বলেন, সতর্ক না থাকলে পরিচর্যাকারীরও এ রোগ হতে পারে।

শ্রমজীবী নারীদের ঝুঁকি:

ঢাকায় শ্যামলীর একটি পোশাকশিল্প কারখানায় কাজ করত বিউটি। কয়েক মাস আগে তাঁর যক্ষ্মা ধরা পড়লে মালিক তাঁকে ছুটি দিয়েছেন, বলেছেন ভালো হলে ফিরে যেতে। তবে প্রথম আলোকে বিউটি বলেন, সুস্থ হলেই যে চাকরি ফেরত পাবেন তাঁর সে আস্থা হয় না।

শহরাঞ্চলে পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কারখানায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে কর্মরত নারীদের যক্ষ্মা হওয়ার ঝুঁকি বেশি। যক্ষ্মা ধরা পড়লে কারখানার মালিক তাদের ছুটি দিয়ে প্রকারান্তরে ছাঁটাই করে দেন।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ১৯৯৩ সাল থেকে ডটস্ (ডিরেক্টলি অবজারভড ট্রিটমেন্ট শর্ট কোর্স) পদ্ধতিতে চিকিৎসাকাজ পরিচালনা করছে। এ পদ্ধতিতে রোজ নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে ওষুধ খেতে হয়। তবে অনেক শ্রমিকই এভাবে কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারে না। অনেকে আবার জানাজানির ভয়েও কেন্দ্রে যেতে চায় না।

কর্মসূচিটির আওতায় ব্র্যাক এখন চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় কাজ শুরু করেছে। ডেমিয়েন ফাউন্ডেশন কাজ করছে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। এ এনজিওটির স্বাস্থ্য ও শিাবিষয়ক সমন্বয়কারী সৈয়দ তারিকুল ইসলাম বলেন, কারখানার খুব কাছে বা ভেতরে সেবা ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের সুবিধা হচ্ছে। শনাক্তকরণের হার ও চিকিৎসা নেওয়া বাড়ছে। তবে তিনি জানান, সব কারখানার মালিকদের এর কার্যকারিতা বোঝানো যাচ্ছে না।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊধর্্বতন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় কর্মসূচিতে পর্যন্ত নারীদের ল্য করে বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেওয়া দরকার।



www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com