'জ্বর, ঠান্ডা, নিউমোনিয়া হওয়ার পর এলাকার হাসপাতালে নিয়া বাচ্চারে শুই দিছি। কিন্তু দুই মাসেও বাচ্চার শুকনা কাশি ছাড়ে না। পরে অনেকে শ্যামলী টিবি কিনিকে আইন্যা দেখাইতে বলছে।' দেড় বছর বয়সের সন্তানকে কোলে নিয়ে বিক্রমপুরের হাসিনা শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের চিকিৎসকের কাছে দাঁড়িয়ে এসব বললেন।
হাসিনার সন্তানের বয়স দেড় বছর হলেও তাঁর ওজন মাত্র সাত কেজি বলে জানালেন সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক। চিকিৎসক এঙ্-রে করে শিশুটির যক্ষ্মা ধরা পড়েছে বলে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে হাসিনার মুখ কালো হয়ে যায়। কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, খরচ কত ইত্যাদি প্রশ্ন করতে থাকেন চিকিৎসককে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু (ফুসফুস) পালমোনলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, 'এক-দুই মাসের শিশুদেরও যক্ষ্মা হতে পারে। পরিবারের সদস্য বা আশপাশে কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত থাকলে শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়।'
মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষক পুষ্টি কর্মসূচি বিভাগের প্রধান ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, শিশুদের যে যক্ষ্মা হয় তা অনেক শিতি লোকও জানে না। 'শিশুদের যক্ষ্মা কম হয়' এ ধরনের মনোভাব শিশুদের দিক থেকে মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশব্যাপী পরিচালিত জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যমতে, ২০০৫ সালে সব ধরনের যক্ষ্মা আক্রান্ত চিহ্নিত শিশুর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৬২৫ জন; ২০০৬ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় চার হাজার ১৭৯ জনে। তবে ২০০৬ সালে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। সেই হিসেবে যক্ষ্মা আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা অনেক কম বা শনাক্তকরণের আওতায় কম আসছে বলে জাতীয় কর্মসূচির কর্তাব্যক্তিরা জানান।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস যক্ষ্মা সংক্রমণে ভূমিকা রাখে। শিশুকে বিসিজির টিকা দেওয়া না হলে, অভিভাবক মাদকসেবী হলে, যক্ষ্মা আক্রান্ত গরুর দুধ শিশুকে খাওয়ালেও শিশুদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেদিক থেকেও দেশের শিশুদের এ রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
ব্র্যাকসহ মোট ২৮টি এনজিওর মাধ্যমে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ব্র্যাক এনজিওগুলোকে তদারকিও করছে। ব্র্যাক ২৮৩টি উপজেলা, ৪২টি জেলার মিউনিসিপালিটি ও পাঁচটি শহর, ২২টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ৪১টি জেলার কারাগারসহ বিভিন্ন এলাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির সমন্বয়কারী ড. আকরামুল ইসলাম বলেন, দেশে যক্ষ্মা আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আসলেই কম নাকি কম শনাক্ত হচ্ছে সে বিষয়টিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় যক্ষ্মা কর্মসূচির অধীনে ব্র্যাকসহ অন্যদের পরিচালিত ডটস (সরাসরি পর্যবেণের মাধ্যমে চিকিৎসা) কেন্দ্রে বড়দের পাশাপাশি শিশুদের বিষয়টিও দেখা হচ্ছে।
আকরামুল ইসলাম জানান, ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং মাতুয়াইলের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ব্র্যাকের সহায়তায় ডটস কেন্দ্র চালু হয়েছে। এ দুটি কেন্দ্রের অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের অন্যান্য এলাকায় শিশুদের দিকে মনোযোগ দিয়ে আরও ডটস কেন্দ্র চালু করা হবে।
শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ডটস কেন্দ্রের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত শাহীদা আক্তার সুলতানা শিশুদের যক্ষ্মা হচ্ছে এ বিষয়টির আরও প্রচার হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের ডটস কেন্দ্রের কর্মসূচি অর্গানাইজার সাবানা সিদ্দিকা জানান, শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যক্ষ্মা রোগীদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় এ কেন্দ্র থেকে নিকটবর্তী ডটস কেন্দ্রে রেফার করে দেওয়া হয়। রোগীরা নিকটবর্তী ডটস কেন্দ্র থেকে ওষুধ খাওয়া সমাপ্ত করে।
শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্ত করার বিষয়টি জটিল। বড়দের যক্ষ্মা হলে ফুসফুসে ছিদ্র হয়, পানি জমে; এঙ্-রে করলে সহজেই শনাক্ত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব লণ বেশির ভাগ েেত্রই থাকে না। শিশুরা কফ দিতে পারে না, এঙ্-রেতেও সব সময় নিশ্চিত হওয়া যায় না। অনেক সময় লণ দেখে শিশু বিশেষজ্ঞরা এ রোগ শনাক্ত করেন।
শ্যামলীর জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের জুনিয়র বিশেষজ্ঞ ডা. ভিকারুন নেছা বেগম শিশু যক্ষ্মা শনাক্ত করার জন্য প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানান।
তবে শিশুদের চিকিৎসা শুরু করতে এক সপ্তাহ দেরি হলেও তা যেন সঠিক হয়, তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভিকারুন নেছা বলেন, 'ভুল চিকিৎসার পরিণতি শিশুদের ক্ষেত্রে ভয়াবহ আকার ধারণ করে।'
মহাখালীর জাতীয় বব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, শিশুদের মধ্যে যক্ষ্মা এখনো অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে কেন কম পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা করা হয়নি। তিনি শিশুদের যক্ষ্মা দ্রুত শনাক্ত করার জন্য শিশু বিশেষজ্ঞদের এবং ওষুধ খাওয়ানোর নিয়মসহ বিভিন্ন বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
শুধু শিশুদের নিয়ে একটি উদ্যোগ
আইসিডিডিআরবি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মধুপুর উপজেলায় শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্ত করার জন্য একটি পরীামূলক প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটি ইউনিয়নের শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সের ৫০ হাজার শিশুকে অন্তভর্ুক্ত করা হবে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া 'ডেভেলপমেন্ট মার্কেট প্লেস অ্যাওয়ার্ড' পুরস্কারের টাকা দিয়ে আইসিডিডিআরবি এ কাজ করবে। প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে গ্রামীণ এলাকায় শিশু যক্ষ্মা পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে বলে আইসিডিডিআরবির প থেকে জানানো হয়েছে।
এ প্রকল্পের আওতায় শিশুর দুই সপ্তাহ বা বেশি সময় ধরে কাশি আছে কি না, সাত দিনের বেশি জ্বর আছে কি না, শিশু অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের মতো খেলাধূলা করে কি না, বাড়িতে আর কারও যক্ষ্মা আছে কি না_এ প্রশ্নগুলোর মধ্যে দুটি উত্তর 'হ্যাঁ' হলে শিশুকে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হবে পরীার জন্য।
অভিভাবকদের করণীয়
আইসিডিডিআরবিতে প্রথমে অভিভাবকেরা শিশুর ডায়রিয়া হয়েছে বলে ভর্তি করাচ্ছেন। ডায়রিয়ার চিকিৎসার সময় শিশুর পুষ্টিসহ অন্যান্য বিষয়ের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তখনই শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া নিয়ে শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করাচ্ছেন অভিভাবকেরা। যক্ষ্মা হয়েছে তাই অভিভাবকেরা শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে এসেছেন এ ধরনের সচেতনতা এখনো কম বলে জানান ডা. তাহমিদ। ডা. তাহমিদ বলেন, শিশুর দুই সপ্তাহের বেশি জ্বর আছে, সাধারণ ওষুধ দিয়ে কাশি ভালো হচ্ছে না, দড়ির মধ্যে গিট দিলে যেমন হয় তেমনি করে গ্ল্যান্ড ফুলে গেছে, শিশুর ওজন কমে গেলে, ওজন একদমই না বাড়লে, রাতে জ্বর হলে_অভিভাবকদের নিজে থেকেই কিছুটা সচেতন হতে হবে এবং শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখাতে হবে।
মায়ের যক্ষ্মা থাকলে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের মুখে কাপড় দিয়ে বা মুখটা শিশুর দিক থেকে পাশ ফিরিয়ে রাখাসহ মায়েদের সতর্ক ব্যবস্থা অবলম্বন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন ডা. ভিকারুন নেছা।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ম্যানুয়ালে গত বছর শিশুদের জন্য আলাদা একটি অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে শিশুর পুষ্টি, বয়স অনুযায়ী ওষুধের পরিমাণ প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যক্ষ্মা কার্যক্রমের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে শিশুদের বিষয়ে প্রচার কম, তাই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকেরা প্রচার আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন।
|