.
যক্ষ্মা সনাক্তকরণে ভোলার অভাবনীয় সাফল্য
- মাহফুজা জেসমিন/ সরেজমিন ভোলা

কর্মসূচি শুরুর মাত্র চার বছরেই যক্ষ্মা সনাক্তকরণে ৯৪% সাফল্য অর্জন করেছে দণি উপকুলের দ্বীপ জেলা ভোলা। ুধা, দারিদ্র, নদী ভাঙন ইত্যাদি নানা প্রতিকুলতা সত্বেও যক্ষ্মা সচেতনতায় অনেকটাই এগিয়ে আছে ভোলার সাধারণ মানুষ। ভোলা সদর থানার দণি চরণাবাদ গ্রামের গৃহবধু ইয়ানুর বেগম পাঁচ মাস আগেও কাশির দমকে দু'মিনিটও টিকতে পারতেন না। তার এ অবস্থা দেখে তার খালা শাশুড়ি প্রথম তাকে কফ পরীার কথা বলেন। খালা শাশুড়ির পরামর্শ অনুযায়ী ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকার মাধ্যমে কফ পরীক্ষা করান। যক্ষ্মা সনাক্ত হওয়ার পর পাঁচ মাস ধরে ঔষধ খাচ্ছেন ইয়ানুর। এখন তিনি অনেকটাই সুস্থ। ৩ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে জরাজীর্ণ কুঁড়ে ঘরে ইয়ানুরের বাস। ঘরের পাশে ডোবার পানিতে দুর্গন্ধ। ঝুপড়ি ঘরে দিনের আলোও প্রবেশ করে না। ডাক হরকরা স্বামীর মাত্র চার হাজার টাকা বেতনে ঘর ভাড়া দিয়ে তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে কোনরকমে দিন চলে তাদের। বিনামূল্যে যক্ষ্মা চিকিৎসা না হলে হয়তো ইয়ানুরের চিকিৎসাই হতোনা কোনদিন । ইয়ানুর জানেন নিয়মিত চিকিৎসায় যক্ষ্মা ভালো হয়। তাই স্বাস্থ্য সেবিকার বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত ঔষধ খেতে ভোলেন না কখনো। সদর থানার আলিনগর ইউনিয়নের সাথিয়া গ্রামের মিনারা বেগম জানালেন, ঢাকার গার্মেন্টসে কাজ করতেন তিনি। বেবি চালক স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল। ৪ মাস আগে হঠাৎ তার যক্ষ্মা ধরা পরে। যক্ষ্মা চিকিৎসার জন্য মিনারা এখন সন্তানদের নিয়ে ভোলায় বাবার বাড়িতে আছেন। ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকার কাছে ঔষধ খাচ্ছেন তিনি। মিনারার বাবা খোরশেদ আলম জানালেন, ১৯৯৭ সালে তার নিজেরও যক্ষ্মা হয়েছিল। তখন তিনি ঢাকায় থাকতেন। পিজি হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে ৯ মাস ঔষধ খেয়ে সুস্থ হয়েছেন । নিয়মিত ঔষধ খাওয়া নিশ্চিত করার জন্য তিনি মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। তিনি আরো জানালেন, দশ বছর আগে তার যখন যক্ষ্মা হয়েছিল, তখন যক্ষ্মার চিকিৎসা এতটা সহজ ছিল না। ফার্মেসী থেকে ২২ হাজার টাকার ঔষধ কিনে খেয়েছেন তিনি। কিন্তু এখন বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যায়। তার মেয়ের চিকিৎসার জন্য সরকারের নির্ধারিত জামানতের টাকাটাও দিতে পারেননি তিনি। কিন্তু তাতে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে থাকে নি।

কখনো রিঙ্া চালক, কখনো পেইন্টার বরিশালের তপন বিশ্বাস। জীবিকার তাগিদে ভোলায় থাকেন ১০ বছর ধরে। তপন বিশ্বাস যক্ষ্মা রোগের নাম শুনেছেন। টিভি বিজ্ঞাপন থেকে জেনেছেন, যক্ষ্মা ভালো হয়। তিনি বলেন, যক্ষ্মা রোগকে ভয় করলেও, যক্ষ্মা রোগীকে দেখে ভয় করার কিছু নেই। সবাই মিলে তাকে সহায়তা করা উচিত। ভোলার লঞ্চে কেবিন বয় হিসেবে কাজ করেন মোঃ সাইফুল। বেশির ভাগ সময়ই থাকতে হয় নদীতে নদীতে। কখোনো যক্ষ্মা রোগী দেখেন নি। তিনি জানালেন, সরকারী হাসপাতাল ও কিনিকে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা আছে। ভোলা সদরের সাথিয়া গ্রামের ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকা বিবি জুলেখা জানালেন, বর্তমানে তার একজন যক্ষ্মা রোগী আছে। রোগীকে তিনি নিয়মিত ঔষধ খাওয়ান। তিনি জানান, যক্ষ্মার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় সব সময়ই একজন না একজন যক্ষ্মা রোগীকে ঔষধ খাওয়াতে হয়। এর আগেও তিন জন যক্ষ্মা রোগীকে ঔষধ খাইয়েছেন তিনি । তারা এখন সুস্থ। দণি চরণাবাদ গ্রামের স্বাস্থ্যসেবিকা বিবি হাজেরা। দুই বছর ধরে ব্র্যাকে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত তিন জন যক্ষ্মা রোগীকে সুস্থ করেছেন। বর্তমানে একজন রোগীকে ঔষধ খাওয়াচ্ছেন। তিনি বলেন, গ্রামে কারো যক্ষ্মার লণ দেখা দিলে কফ পরীার মাধ্যমে তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা হয়।

ভোলা'র সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আব্দুর রশীদ বলেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ২০০৩ সালে ভোলায় প্রথম কাজ শুরু করে। বরিশাল বিভাগের মধ্যে যক্ষ্মা সনাক্তকরণে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ভোলা। ২০০৬ সালে ভোলায় যক্ষ্মা সনাক্তকরণের হার ৯৪% । ২০০৫, ২০০৪ ও ২০০৩ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৭৪%, ২৪% ও ১৪%। এত অল্প সময়ে ধারাবাহিক সাফল্য তৈরি করার পেছনে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবিকাদের অনন্য ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ভোলায় সরকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ দেয়া আছে যে, প্রত্যেককে মাসে অন্তুতঃ একজন যক্ষ্মা রোগীকে খুঁজে বের করতে হবে। আর এ বিশেষ ব্যবস্থার জন্যই ভোলায় এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ভোলার গৃহবধু, রি চালক, বন্দর শ্রমিক, উন্নয়ন কর্মী, সবাই জানে যক্ষ্মা ভালো হয় এবং বিনামূল্যে যক্ষ্মার চিকিৎসা পাওয়া যায়। এ সচেতনতা যক্ষ্মা সনাক্তকরণে অনেকটাই ভূমিকা রেখেছে। ভোলায় কর্মরত ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচি'র আঞ্চলিক স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী মো: মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যা অধু্যষিত ভোলায় ব্র্যাকের ১২৭৮ জন স্বাস্থ্যসেবিকা, ৪৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৮৭ জন সরকারী স্বাস্থ্যকর্মী আছে। তারা প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। তিনি জানান, ভোলার বেশির ভাগ যক্ষ্মা রোগীই সনাক্ত হয় সরকারী ও বেসরকারী এসব স্বাস্থ্যকর্মী/স্বাস্থ্য সেবিকার মাধ্যমে। প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে যক্ষ্মা সম্পর্কিত তথ্য প্রচার করে জনগণকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি একজন যক্ষ্মা রোগী'র কফ পরীা থেকে শুরু করে চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সব পর্যায়ে সহায়কের ভূমিকাও পালন করেন তারা ।


www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com