.
বছর বছর অল্যে রয়ে যাচ্ছে লাখো যক্ষ্মা রোগী,
সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি।
- মাহফুজা জেসমিন

সমপ্রতি বাংলাদেশ যক্ষ্মা সনাক্তকরণে উন্নয়ন ল্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও পরিসংখ্যানিক ত্রুটির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিপি)। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার দেশব্যাপি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাথে সমন্বিতভাবে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত প্রিভেলেন্স সার্ভে'র ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে যক্ষ্মার বর্তমান পরিস্থিতি নির্ণয় ও এনটিপি'র কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কতর্পক্ষ নির্ধারিত ARTI (এ্যানুয়াল রিস্ক অব টিবি ইনফেকশন) অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর কমপ ৩ লাখ লোক নতুনভাবে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ৭০ হাজার লোক যক্ষ্মার কারণে মৃতু্য বরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের জন্য ২০০৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা রোগী সনাক্তকরণের ল্যমাত্রা ৭০% নির্ধারণ করে দেয়। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ২০০৫ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলেও ২০০৬ সালে বাংলাদেশে ৭১% যক্ষ্মা রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। (বার্ষিক প্রতিবেদন ২০০৬, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (প্রকাশাধীন)।২০০৫ সালে এই হার ছিল ৬১%। ২০০৪ ও ২০০৩ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৪৬% ও ৪১%। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী সনাক্তকরণের হার ৭০% হিসেবে অব্যাহত থাকলে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে যক্ষ্মা মৃতু্যর হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তুু প্রতিবছর নতুনভাবেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছে ৩ লাখ। এর সাথে রয়েছে আগের বছরের প্রায় ১ লাখ রোগী। অথর্্যাৎ প্রতি বছর ৭০% যক্ষ্মা রোগী সনাক্ত হলেও বাকি ৩০% ভাগ থেকে যাচ্ছে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র আওতার বাইরে। এই ৩০% যক্ষ্মা রোগী কোথায়, কার কাছে যাচ্ছে, কি ওষুধ খাচ্ছে এবং তারা আদৌ সুস্থ হচ্ছে কিনা এর কোন হিসেব এনটিপি'র কাছে নেই। ফলে যারা সরকারি চিকিৎসা গ্রহণ করেন না, তাদেরকে এর আওতায় আনা সম্ভব নয়। এনটিপি'র তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ৫৯%, ২০০৪ সালে ৫৪%, ২০০৫ সালে ৩৯% এবং সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৯% রোগী সনাক্ত করা যায়নি। প্রতি বছর অজানা এই বিশাল সংখ্যক রোগী কি চিকিৎসা সেবা পেল বা না পেলো তাও এনটিপি জানেনা। কেননা, যক্ষ্মা'র চিকিৎসার মূল বিষয় হচ্ছে একনাগাড়ে ছয় মাস নিয়মিত ঔষধ খাওয়া। কিন্তু যারা ফার্মেসি বা প্রাইভেট ডাক্তার-এর কাছ থেকে চিকিৎসা নেন, তারা শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা করেছেন কিনা বা করলেও কতটা সুস্থ হয়েছেন তা জানার কোন ব্যবস্থা নেই। এতে করে দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সমাজে। একদিকে অসনাক্তকৃত যক্ষ্মা রোগীরা তার আশে পাশের ব্যক্তিদের মধ্যে যক্ষ্মা ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে যারা সনাক্ত হয়েও চিকিৎসা সম্পূর্ণ করছেন না, তারা হয়ে যাচ্ছেন ঔষধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বা Multi-Drug Resistant (MDR)-TB রোগী। এই MDR টিবি রোগী আবার ছড়াচ্ছেন MDR জীবাণু। বিশেষজ্ঞদের মতে, MDR-TB'র চিকিৎসা ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদী। এ চিকিৎসা করার সামর্থ্য বেশির ভাগ রোগীদেরই নেই। এছাড়া MDR-TBর চিকিৎসা সাফল্যও কম । ফলে প্রতি বছর নতুন ৩ লাখ যক্ষ্মা রোগীর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আগের লাখো যক্ষ্মা রোগী। যারা সব সময়ই থেকে যাচ্ছে এনটিপি'র আওতার বাইরে। সামাজিক সংস্কারও যক্ষ্মা জয়ের অন্যতম বাধা। কারো যক্ষ্মা হয়েছে জানলে তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনা এখনো বিরল নয়। এখনো অনেকেই যক্ষ্মা রোগ হলেও গোপন রাখে এবং তাতে চিকিৎসাও ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতিতে অজ্ঞাত রোগীদেরকে সনাক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

অসনাক্তকৃত এই বিশাল সংখ্যক যক্ষ্মা রোগীদের বাদ দিয়ে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র সাফল্য সম্ভব নয়। একে এনটিপি'র আওতায় আনতে সরকারি তৎপরতা সম্পর্কে এনটিপি'র পরিচালক এবং টিবি ও ল্যাপ্রোসি'র লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডাঃ প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি কোন একক প্রতিষ্ঠান নয়। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পরিচালিত এ কর্মসূচি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় কাজ করছে। সরকার সারাদেশে প্রতিটি উপজেলায় বিনামূল্যে কফ পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে এবং যক্ষ্মা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে। এরপরও মানুষ চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যায়, যেতে বাধ্য হয়। তার মতে, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সামাজিক বাধা সবচেয়ে বড়। দারিদ্র্য, অশিা, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। ফলে রোগগুলো তাদের মধ্যে বাড়তেই থাকে। তাদেরকে সচেতন করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, এনটিপি তার সাধ্যমত যক্ষ্মা চিকিৎসা মানুষের দ্বারে দ্বারে পেঁৗছানোর ব্যবস্থা করছে। তারপরও মানুষকে আরো সচেতন করার জন্য সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, সকলের।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় বব্যধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে এনটিপি'র আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যক্ষ্মা প্রতিরোধে গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উন্নয়ন ল্যমাত্রা পূননির্ধারণের সুপারিশ করেছেন জাতীয় বব্যধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারি অধ্যাপক, ডাঃ কাজী সাইফউদ্দিন বেননূর। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অতি পুরাতন গবেষণা ও নির্ণীত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে যে কার্যক্রম চলছে তাকে সত্যিকার সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজন নতুন করে গবেষণা।'
ব্র্যাক এডভোকেসি এ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ইউনিটের পরিচালক আফসান চৌধুরী বলেন, অতি পুরাতন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে দেশে যে কার্যক্রম চলছে তাতে দেশে যক্ষ্মার বর্তমান ও প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে জরিপ করে এসব তথ্য দিয়েছিল তার ভিত্তিও ছিল নাজুক। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সুশিল সমাজকে সম্পৃক্ত করতে চাইলে তাদেরকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। সঠিক তথ্য না জানালে জনসম্পৃক্ততা পাওয়া যাবেনা।

আইসিডিডিআরবি'র এপিডেমিওলজিস্ট ডাঃ কে জামান জানান, সমপ্রতি বাংলাদেশে ন্যাশনাল টিবি প্রিভেলেন্স সার্ভে শুরু হয়েছে। ইউএসএইড-এর অর্থায়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এনটিপি'র সহায়তায় আইসিডিডিআর,বি এ জরিপ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে পরিচালিত এই জরিপ কার্যক্রমের প্রধান গবেষক ডাঃ কে. জামান জানান, এ পর্যায়ে বাংলাদেশের ৪০ টি উপজেলায় প্রিভেলেন্স সার্ভে করা হচ্ছে। এতে ৫০ হাজার লোকের যক্ষ্মা জীবাণু পরীা করে দেশের বর্তমান যক্ষ্মা পরিস্থিতি নির্ণয় করা হবে। তিনি আরো জানান, এ জরিপ কাজ শেষ হতে প্রায় ১ বছর সময় ব্যায় হবে।

www.panossouthasia.org www.panosaids.org www.panossouthasia.org www.machizo.com