বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নির্দেশনায় ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশে পিআরএসপি (Poverty Reduction Strategy
Paper) প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ এই পিআরএসপির আওতায় আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) পিআরজিএফ (Poverty Reduction Growth Facilities) ঋণ পাঁচ বছর রেয়াতে দশ বছরে পরিশোধযোগ্য ০.৫% হারে ঋণ প্রদান করবে, যার শর্ত হচ্ছে, উক্ত কৌশলপত্রকে হতে হবে অংশগ্রহণমুলক প্রক্রিয়ায় তৈরি, দেশীয় মালিকানাসম্পন্ন এবং এমডিজি (Millennium Development Goals) কে কেন্দ্র করে ১৫ বছরের ল্যকে সামনে রেখে প্রণীত৷ বিশ্বের প্রায় সকল সরকারি দাতা সংস্থা পিআরএসপি প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করে৷ বলা হয়েছে যে, এর আওতায় সহায়তাসমূহ প্রদান করা হবে৷ পৃথিবীর সকল অনুন্নত দেশ এই প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে একমাত্র ভারত ছাড়া৷ ভারত বলে যে, তাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাই হচ্ছে
পিআরএসপি৷ অনেক দেশ দায়সারা গোছের প্রক্রিয়ায় পিআরএসপি তৈরি করলেও ভিয়েতনামের মতো দেশ জাতীয় সংসদসহ সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পিআরএসপি তৈরি করে৷ অতিমাত্রায় গাইড করার চেষ্টার কারণে খোদ বিশ্বব্যাংকের ভেতরও পিআরএসপিতে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে৷ বাংলাদেশ মার্চ ২০০৩ এ অন্তর্বর্তীকালীন পিআরএসপি (I-PRSP) প্রণয়ন করে এবং ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ পিআরএসপির খসড়া কপি প্রকাশ করে৷ একনেক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করার পর সরকার অক্টোবর ২০০৫-এ পূর্ণাঙ্গ পিআরএসপি'র চূড়ান্ত দলিল প্রকাশ করে৷ প্রথম থেকে অনেক এনজিও ও নাগরিক সংগঠন এ বিষয়ে বিভিন্ন মত ও সমালোচনা করে আসছে৷ এর মধ্যে সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) অন্যতম৷ তারা এটাকে আলোচনার জন্য জেলা পর্যায়ে নিয়ে গেছে৷ সুপ্র'র মূল উদ্দেশ্য হল, দারিদ্র্য হ্রাসকরণ নিয়ে যেন গণবিতর্ক তৈরি হয়, সরকার যেন জনগণের বিশেষ করে গরিব মানুষের কথা শোনে এবং আন্তজার্তিক অর্থলগি্নকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের (International Financial Institution - IFI) প্রকৃত স্বরুপ উন্মোচন করা যায়৷ সুপ্র মনে করে, আন্তজার্র্তিক অর্থলগি্নকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তথাকথিত মুক্ত বাজার সৃষ্টির নামে উন্নয়নশীল দেশে উন্নত দেশ তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজার সৃষ্টির হস্তপে নিয়ে যদি নাগরিক সমাজের ভেতর সমালোচনা হয় তাহলে প্রগতিশীল একটি সরকারের পক্ষে তাদের সাথে দর কষাকষি করার সুযোগ বাড়ে৷ উল্লেখ্য যে, ঐসব প্রতিষ্ঠান ও ডবি্লওটিও'র বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত ও আন্দোলন জোরদার হচ্ছে৷ এইসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে সুপ্র ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করছে৷ তার মধ্যে
উল্লেখযোগ্য হল,
১. পিআরএসপি'র মূল দলিলের বাংলা ভাবানুবাদ প্রকাশ ও অবস্থানপত্র প্রকাশ;
২. বাজেটপূর্ব ও বাজেট-পরবর্তী সেমিনারের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে পিআরএসপি নিয়ে আলোচনার আয়োজন;
৩. সেমিনার ও টিভি বিতর্কের মাধ্যমে পিআরএসপি বিষয়ে তৃণমূল মানুষের চিন্তা-চেতনাকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে৷
পদ্ধতিগত সমস্যা এবং এ মুহূর্তের দাবি
অনেক দেশ পিআরএসপি তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায়, তাদেরই দেয়া বিদেশি পরামর্শক নিয়ে৷ সেক্ষেত্রে আমাদের সরকার বলেছে, তারা দেশের সম্পদ ব্যবহার করে এই দলিল তৈরি করেছে৷ দেশীয় পরামর্শক ব্যবহার করা হয়েছে৷ আমরা একে সাধুবাদ জানাই৷ সরকার যেভাবে পিআরএসপি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে তাহলো; এক্ষেত্রে ২০ টি সংগঠনের (ভিপিকেএ, বিএনএনআরসি, পিপিআরসি, টিএমএসএস, সমতা, গণসারতা অভিযান, সলিডারিটি, সমুন্নয়, স্ব-উন্নয়ন, উই, এসএসএস, ভয়েস, কেয়ার বাংলাদেশ, সেভ দ্য সিলড্রেন (ডেনমার্ক ও সুইডেন), ডরপ, প্রদীপ, এডিডি, দর্পণ, স্বাবলম্বী, সেড, আইজল ও পেভ) মতামত নিয়ে সুপ্র-র দাবি হচ্ছে; (১) দলিলটি বাংলায় প্রকাশ করা হোক, যাতে আপামর জনগণ অংশগ্রহণ করতে পারে; (২) অন্ততপ েদলিলটি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং নিয়ে সকল বিভাগীয় পর্যায়ে ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিবিড়ঢ়ভাবে আলোচনা করা হোক; (৩) একটি অংশগ্রহণমূলক ওয়েবসাইট ( উদাহরণস্বরূপ : www.gobprsp.org) চালু করা হোক; (৪) জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হোক, বিরোধী দলীয় সদস্যদের আহবান করা হোক; টিভি বিতর্কের আয়োজন করা হোক এবং অন্তত: টিভিতে হলেও রাজনীতিকদের আমন্ত্রণ করা হোক; (৫) সরকারের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটি, বিশেষজ্ঞ ও এনজিওদের সমন্বয়ে পিআরএসপি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হোক; (৬) পিআরএসপি বাস্তবায়নের প্রভাব নিরপেভাবে মূল্যায়ন করা হোক, যেমন: সরকারি সেবার বেসরকারিকরণের প্রভাব, কৃষিখাতে সাবসিডির প্রকৃত অবস্থা, দারিদ্র্য বিমোচনে আয় বৈষম্যের গতিবিধি, জিডিপি বৃদ্ধি ও দরিদ্র মানুষের আয়ে প্রভাব ইত্যাদি হতে পারে ৷ অক্টোবর ২০০৫-এর পিআরএসপি ও জানুয়ারি ২০০৫ এ যেসব বিষয় নতুন সংযোজন করা হয়েছে, তাহলো; ক. ভূমি প্রশাসনের সংস্কার; খ. নগর দারিদ্র্য; গ. বৈদেশিক বিনিয়োগকে উত্সাহিত করা; ঘ. ব্যক্তিক ব্যবসার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ; ঙ. পর্যটন ও দারিদ্র্য বিমোচন; চ. আদিবাসী ইসু্য (শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন, ভূমি কমিশন, নিজস্ব শিক্ষা কারিকুলাম, বিদ্যুত্-টেলিযোগাযোগ, অন্যান্য দেশের শিণ) ছ. সুশাসন, জ. পূর্ণাঙ্গ মনিটরিং নির্দেশক৷
আই-পিআরএসপিতে অংশগ্রহণমূলক আলোচনায় বিভিন্ন অভিমত রীতিমতো সংবেদনশীল হলেও তা জনগণের অভিমত
হিসাবে তুলে আনা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ করা হয়েছে৷ যেমন: রাজনৈতিক দলীয় সংস্কৃতিতে দুর্বৃত্তায়ন, গণমাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রা প্রতিফলিত না হওয়া, গ্রামের মানুষের জন্য আলাদা টিভি চ্যানেলের দাবি ইত্যাদি৷ কিন্তু এই দলিলটিতে বিভিন্ন মানুষের দেয়া সেনসেটিভ ভিন্নমতগুলো আসেনি৷ অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির মৌলিক বিষয় হল, বিষয়টি সমাধান করা হোক বা না হোক; সেনসেটিভ ভিন্নমতগুলো একটা অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করে স্বীকৃতি দিতে হবে৷ পূর্ণাঙ্গ পিআরএসপির দলিল প্রণেতারা এ কাজটা না করে পদ্ধতিগত সততার মূল্যবোধকে অবহেলা করেছেন৷ পদ্ধতির ক্ষেত্র্রে আরেকটি বড় দুর্বলতা হল, বিশেষ করে সভাগুলো ছিল আমলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত৷ আমলা নন এমন অংশগ্রহণকারী যেমন এনজিও কর্মী, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারেননি, এটা ঢাকায় বিষয়ভিত্তিক দলগুলোর েেত্রও হয়েছে৷ সবচেয়ে লণীয় বিষয় হল, সকল পর্যায়ে কোথাও কোন রাজনীতিবিদ অংশগ্রহণ করানোর চেষ্টাই হয়নি৷ এমনকি জোট সরকারের সংসদ সদস্য, জেলা পর্যায়ের নেতাদেরও অংশগ্রহণ করানো হয়নি৷ আমাদের
কথা হল, রাজনৈতিকভাবে ঐকমত্য নাও হতে পারে, কিন্তু বর্তমান জোট সরকারের রাজনীতিবিদরা তো অংশ নিতে পারতেন, এটা রাজনৈতিকভাবে তাদের দারিদ্র্য দুরীকরণ কৌশল হিসাবেও ঘোষিত হতে পারত৷ এ পর্যন্ত সরকারি দলের কোন নেতা এমনকি যেসব মন্ত্রী প্রতিনিয়ত কথা বলেন, তারাও পিআরএসপির কোন বিষয় নিয়ে কোন কথা বলেননি৷ যা হোক, আমরা স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ করতে পারি যে, তারা এটা পড়েছেন কি না৷ বিরোধি দলের নেতারাও এ বিষয়ে এখনো কোন কথা বলেননি৷ দেশের ৪০-৫০ শতাংশ জনসমষ্টি যখন দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করছে তখন তাদের কাছ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণ কৌশল নিয়ে মুক্ত আলোচনা ও দিক নির্দেশনা জাতির স্বাভাবিক প্রত্যাশা৷ |