আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ২৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রত্য ও পরোভাবে নারীর মতায়নে ভূমিকা রাখবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সরকারের ৫১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জেন্ডার-সমতাকরণ ব্যয় দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৭শ' ৭ কোটি টাকা। ফলে নারীর জন্য বাজেটের এক তৃতীয়াংশের কম অর্থ ব্যয় হবে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেন্ডার-সমতাকরণে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে তার সিংহভাগই নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে প্রত্য ভূমিকা রাখবে না।
২০০৭-০৮ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটেই সর্বপ্রথম জেন্ডার-সমতাকরণ ব্যয়ের খাতওয়ারি সুনির্দিষ্ট হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, বিপিসির দায় বাদে আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রাক্কলিত ৭৯ হাজার ৬শ' ১০ কোটি টাকার ৭ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রত্যভাবে নারীর মতায়নে ভূমিকা রাখবে। এর বাইরে বাজেটের ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ ব্যয় পরোভাবে নারী উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তবে বিপিসির দায়সহ হিসাব করলে বাজেটে নারীর অংশীদারিত্ব আরও কমে যাবে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চলতি (২০০৬-০৭) অর্থবছরের তুলনায় জেন্ডার-সমতাকরণ ব্যয় ৪ হাজার ৫শ' ২৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেটে এ ধরনের ব্যয়ের পরিমাণ ১৪ হাজার ১শ' ৮৩ কোটি টাকা_ যা বাজেটের ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীসহ সকল সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মাধ্যমে মূলধারায় সম্পৃক্ত করাকে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এবারই সর্বপ্রথম সরকারের প্রতিটি ব্যয়ের দারিদ্র্য ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা পরীা করে দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের কতটুকু নারীর মতায়নে ভূমিকা রাখবে_ তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে জেন্ডার-সমতাকরণ ব্যয়ের হিসাব প্রণয়ন করা হয়েছে। সূত্র জানায়, পর্যায়ক্রমে সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের জেন্ডার-সমতা ও দারিদ্র্য সংবেদনশীল কার্যক্রম স্পষ্ট করা হবে। এর মাধ্যমেই ভবিষ্যতে বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ বিবেচনা করা হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনায় নারী উন্নয়নের হিস্যা সম্পর্কে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (এমটিবিএফ) অনুসরণের জন্য বাজেট প্রণয়নে অব্যাহত সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জেন্ডার-সমতাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কার্যক্রমকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর আলোকেই বাজেটের জেন্ডার-সমতাকরণ ব্যয়ের একটি প্রাথমিক হিসাব প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাজেটে নারীর জন্য বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মাতৃমৃতু্য ও শিশুমৃতু্যর হার কমাতে এবারই প্রথমবারের মতো 'দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা' নামে একটি পাইলট কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় হতদরিদ্র মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সন্তানকে দুগ্ধদান এবং সুন্দর, সবল শিশুর জন্ম ও বেড়ে উঠার ল্যে গর্ভধারিণী হতদরিদ্র মাকে প্রতিমাসে ৩শ' টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হবে। প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার ইউনিয়নে মোট ৪৫ হাজার মাকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। বাজেটে এ খাতে ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে বিধবা ও দুস্থ মহিলা ভাতার হার ২শ' টাকা থেকে বাড়িয়ে ২শ' ২০ টাকা এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা সাড়ে ৬ লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ লাখ করা হয়েছে।
বাজেটে দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি), ছাত্রী উপবৃত্তি, মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা ভাউচার স্কিম, এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি পুষ্টি কার্যক্রম ও মহিলাদের বৃত্তিমূলক প্রশিণ কার্যক্রম সমপ্রসারণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের আত্দকর্মসংস্থানের জন্য ুদ্রঋণ বাবদ ২০ কোটি টাকা এবং এসিডদগ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের কল্যাণে ২৫ কোটি টাকা এবং তাদের দতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিণ বাবদ ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে_ যার সিংহভাগই নারী শ্রমিকদের জন্য ব্যয় হবে।
নারীদের প্রত্য কর্মসংস্থানের জন্যও বাজেটে পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। 'সরকারি সম্পদ সংরণে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সুবিধা' শীর্ষক এ কর্মসূচির আওতায় ৩শ' ৮৭ ইউনিয়নে ২৪ হাজার দুস্থ মহিলার কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাজেটে নারীর জন্য যে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে তার সিংহভাগই ব্যয় হবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনস্ত দফতরসমূহে কর্মরত নারীদের বেতন-ভাতায়। সরকারি চাকরিতে বর্তমানে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ১৫ শতাংশ। ফলে রাজস্ব বাজেটের সিংহভাগ নারীর মতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে না।
বিভিন্ন খাতে নারীর জন্য যে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে সরকারের প থেকে তার কোনও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাছাড়া বাজেটে নারীর স্বাস্থ্যসেবা, বিজ্ঞান শিা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে তার অংশগ্রহণ সম্পর্কে কোনও পদপে গ্রহণ করা হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী মন্ত্রণালয় ও বিভাগওয়ারী হিসাবে, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ১ কোটি টাকা (২০ শতাংশ), সংসদ সচিবালয়ের ৪ কোটি টাকা (১৩.৭৯ শতাংশ), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪৮ কোটি (১৩.৬০), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২ কোটি (৮), নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ১শ' ৭ কোটি (১৯.৯৬), সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ১শ' ৪০ কোটি (১৯.৮৬), সরকারি কর্মকমিশনের ২ কোটি (১৮.১৮), অর্থ বিভাগের ৪ হাজার ১শ' ৮৬ কোটি (১৯.৩১), কমপ্রোটলার ও অডিটর জেনারেল অফিসের ৫ কোটি (৭.২৫), আইআরডি'র ১শ' ৪ কোটি (১৩.৯৬), ইআরডির ১শ' ১৮ কোটি (৯.৮৫), পরিকল্পনা বিভাগের ১শ' ৬ কোটি ( ১৭.৭৩), আইএমইডির ৯ কোটি (১৯.১৫), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৯ কোটি (১৪.৯৬), পররাষ্ট্রের ২৪ কোটি (৯.৬০), প্রতিরার ২শ' ৫৫ কোটি (৪.৬৬), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক ৫১ কোটি (১৭.৬৫), স্বরাষ্ট্র ৯শ' ১ কোটি (২০.৩৩), প্রাথমিক ও গণশিার ১ হাজার ৫শ' ৮৪ কোটি (২৮.২৪), শিার ২ হাজার ৫শ' ৫১ কোটি (৩৯.০১), বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগের ৪৭ কোটি (২০.৫২), স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণের ১ হাজার ৩শ' ৩৯ কোটি (২৪.৪৪), সমাজকল্যাণের ২শ' ৯৫ কোটি (৩৬.৪২), মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৮শ' ১৬ কোটি (৪২.৭৭), শ্রম ও কর্মসংস্থানের ২০ কোটি (১৬.৯৫), গৃহায়ন ও গণপূর্তের ৫৩ কোটি (৭.২০), তথ্যের ৩০ কোটি (৬.৫৮), সংস্কৃতির ৯ কোটি (৬.৭৪), ধর্মের ১১ কোটি (৬.২৯), যুব ও ক্রীড়ার ২৭ কোটি (১৫.৮৮), স্থানীয় সরকার বিভাগের ১ হাজার ১শ' ৫৫ কোটি টাকা (১৭.১৯), পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ের ৫৫ কোটি (১৬.৩৩), শিল্পের ১শ' ১৮ কোটি (৩৫.৫৪), বস্ত্র ও পাটের ৭ কোটি (৮.৬৪), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ২৫ কোটি (৩.৩২), কৃষির ১ হাজার ২শ' ৮৩ কোটি (২৯.৫৮), মৎস্য ও পশুসম্পদের ৯৬ কোটি ( ১৭.৬১), বন ও পরিবেশের ৪২ কোটি (১৬.৬৭), ভূমির ৫৬ কোটি (১৫.৬৯), পানিসম্পদের ১শ' ৮ কোটি (৩.৮৩), খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ১ হাজার ৮শ' ৯৮ কোটি (৭৭.২৮), যোগাযোগের ৮শ' ৩৬ কোটি (১৫.১২), নৌপরিবহনের ৩৩ কোটি (১২.৭৯), বেসামরিক বিমান পরিবহনের ২ কোটি (৮.৩৩), ডাক ও টেলিযোগাযোগের ৯৮ কোটি (৭.৩০), পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ৫৮ কোটি (৭), বিদু্যৎ বিভাগের ৪শ' ১২ কোটি (১০.৭৫), সুপ্রিম কোর্টের ১ কোটি (৩.৭০), মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১১ কোটি (৯.৫৭), প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৫ কোটি (১৩.৫১) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ১ কোটি টাকা (৬.৬৭ শতাংশ) প্রত্য বা পরোভাবে জেন্ডার-সমতাকরণে ভূমিকা রাখবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
|