আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ৪৫ হাজার ৩শ' ৯৪ কোটি টাকা প্রত্য ও পরোভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খাতওয়ারি বরাদ্দের হিসাবসহ এ তথ্য দেওয়া হলেও বাজেট বাস্তবায়িত হলে আগামী এক বছরে দেশে কী হারে দারিদ্র্য নিরসন হবে_ তার কোনও ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। তাছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন কোনও দিকনির্দেশনাও বাজেটে নেই। এ কারণেই সরকারের দিক থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাজেটে বিশাল বরাদ্দের দাবি করা হলেও একে ল্যহীন প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। গতানুগতিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের ধারা অব্যাহত রেখে এ বাজেট প্রকৃত দারিদ্র্য বিমোচনে কতোটা ভূমিকা রাখতে পারবে_ সে বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনে যে বিশাল বরাদ্দ দেখানো হচ্ছে প্রকৃতপ েতা শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ রাজস্ব খাতে ব্যয়কৃত অর্থ কোনওভাবেই দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারে না। এ খাতের অর্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়। এটা কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে যুক্ত বোধগম্য নয়।
তিনি বলেন, বরাদ্দকৃত অর্থ দারিদ্র্য বিমোচনে কতোটা সহায়ক হবে তা নির্ভর করছে এ অর্থ সরাসরি গরিব মানুষের কাছে পেঁৗছানো যাচ্ছে কিনা_ তার ওপর। বাজেটে এ বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা দিকনির্দেশনা নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০০৭-০৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মোট বরাদ্দকৃত অর্থের ৫৭ শতাংশই প্রত্য ও পরোভাবে দারিদ্র্য বিমোচনের েেত্র ভূমিকা রাখবে। বাজেটের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ সামাজিক মতায়ন ও নিরাপত্তা বেষ্টনির অনুকূলে সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পেঁৗছানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ল্যে বাজেটে ঋণ প্রদান ও বিশেষ তহবিল গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে_ তার কোনও পূর্বাভাস বাজেটে দেওয়া হয়নি।
প্রতিটি বাজেটেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশাল বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাবে তা সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কোনও সুফল বয়ে আনতে পারেনি। রাজনৈতিক সরকারগুলোর আমলে বাজেটের জনকল্যাণমূলক ল্যগুলো বাস্তবায়নের েেত্র দুর্নীতি, লুটপাট ও দলীয়করণ প্রবণতাকেই দায়ী করা হয়েছে। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাজেট ঘোষিত হওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনের ল্যে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণীত হবে বলে অর্থনীতিবিদরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। একইসঙ্গে দারিদ্র্য বান্ধব ও কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিটি খাতে এর সম্ভাব্য ফলাফল হিসাবে আনারও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছিলেন অনেকে। কিন্তু বরাদ্দকৃত অর্থের সুনির্দিষ্ট হিসাব তুলে ধরা হলেও নতুন বাজেটে অর্থ ব্যয়ের নতুন কোনও দিকনির্দেশনা নেই বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
২০০৭-০৮ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটেই সর্বপ্রথম খাতওয়ারি দারিদ্র্য বিমোচন-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি)'র ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় হবে_ যা মোট বাজেটের ৫৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এরমধ্যে বাজেটের ৪০ দশমিক ৫৮ শতাংশ সরাসরি এবং ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরোভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে। চলতি (২০০৬-০৭) অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার ৪শ' ৯৮ কোটি টাকা_ যা বাজেটের ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাজেটে বরাদ্দকৃত অনুন্নয়ন রাজস্ব ব্যয় খাতে ২২ হাজার ৯শ' ৯৩ কোটি টাকা (৪৭.৫২ শতাংশ), অনু্ন্নয়ন মূলধন ব্যয়ের ৮শ' ৭৪ কোটি টাকা (১৯.৩৭ শতাংশ), ঋণ ও অগ্রিমের ৬৮ কোটি টাকা (১.৩৩ শতাংশ), কাঠামোগত সমন্বয়ের ৩শ' কোটি টাকা (১শ' শতাংশ), কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অনুন্নয়ন বাজেটের অর্থায়নে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ১ হাজার ২শ' ৩৯ কোটি টাকা ( ৭৯.৫৩ শতাংশ), বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)'র ১৯ হাজার ৪শ' ৫৬ কোটি টাকা (৭৩. ৪২ শতাংশ) এবং এডিপি-বহির্ভূত কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ও স্থানান্তর খাতের ৪শ' ৬৪ কোটি (১শ' শতাংশ) পরো ও প্রত্যভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী মন্ত্রণালয় ও বিভাগওয়ারী হিসাবে, সংসদ সচিবালয়ের ১ কোটি টাকা (৩.৩৩ শতাংশ), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১শ' ৯৩ কোটি (৫৪.৫২), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৪ কোটি (১৫.৩৮), নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ১ কোটি (০.১৯), সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ১শ' ৬৪ কোটি (২৩.২৩), সরকারি কর্মকমিশনের ২ কোটি (১৬.৬৭), কমপ্রোটলার ও অডিটর জেনারেল অফিসের ১০ কোটি (১৪.৪৯), আইআরডি'র ৪৬ কোটি (৬.১৭), ইআরডির ২৯ কোটি (২.২৩), পরিকল্পনা বিভাগের ৪শ' ৭৭ কোটি ( ৭৯.৭৭), আইএমইডির ৬ কোটি (১২.৭৭), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৫ কোটি (১১.৮৮), পররাষ্ট্রের ২ কোটি (০.৮০), প্রতিরার ৮২ কোটি (১.৫০), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক ২০ কোটি (৬.৯২), স্বরাষ্ট্র ১ হাজার ৪শ' ৩৮ কোটি (৩২.৪৫), প্রাথমিক ও গণশিার ৫ হাজার ৪শ' ৭৪ কোটি (৯৭.৫৮), শিার ৫ হাজার ৭শ' ৪৮ কোটি (৮৭.৮৯), বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগের ১৮ কোটি (৭.৮৬), স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণের ৫ হাজার ৩শ' ৫৬ কোটি (৯৭.৭৬), সমাজকল্যাণের ৭শ' ৯০ কোটি (৯৭.৫৩), মহিলা ও শিশু বিষয়ক ৭শ' ৭৬ কোটি (৯৫.১০), শ্রম ও কর্মসংস্থান ১শ' ১৬ কোটি (৯৮.৩১), গৃহায়ন ও গণপূর্ত ১শ' ৬৭ কোটি ( ২২.৬৯), তথ্য ৯৭ কোটি (২১.২৭), সংস্কৃতি ২৬ কোটি ( ১৮.৭১), ধর্ম ১শ' ১৪ কোটি (৬৫.১৪), যুব ও ক্রীড়া ১শ' ১২ কোটি (৬৫.৮৮), স্থানীয় সরকার ৬ হাজার ১শ' ৮৩ কোটি টাকা ( ৯২.০১), পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ৩শ' ২৭ কোটি (৯৫.৮৯), শিল্প ২শ' ২৮ কোটি (৬৮.৬৭) বস্ত্র ও পাট ৪৪ কোটি (৫৪.৩২), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ ২শ' ৩০ কোটি ( ৩০.৫০), কৃষি ৪ হাজার ৪৫ কোটি (৯৩.২৭), মৎস্য ও পশুসম্পদ ৪শ' ৭৯ কোটি ( ৮৭.৮৯), বন ও পরিবেশ ১শ' ৮০ কোটি (৭১.৪৩), ভূমি ৬৩ কোটি (১৭.৬৫), পানিসম্পদ ১ হাজার ২শ' ৫৭ কোটি ( ৮৯.০৯), খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ২ হাজার ১শ' ২ কোটি (৮৫.৫৯), যোগাযোগ ৩ হাজার ৪৯ কোটি (৫৫.০৬), নৌপরিবহন ৫৬ কোটি (২১.৭১), বেসামরিক বিমান পরিবহন ৬ কোটি (২৫), ডাক ও টেলিযোগাযোগ ৪৩ কোটি (৩.২০), পাবর্ত্য চট্টগ্রাম ৩শ' ৮৫ কোটি (৯৩), বিদু্যৎ ২ হাজার ২শ' ৫৭ কোটি (৫৮.৯০), সুপ্রিম কোর্ট ২ কোটি (৭.৪১) মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১শ' ২ কোটি (৮৮.৭০) এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২৭ কোটি (৭২.৯৭ শতাংশ) টাকা দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় হবে।
দারিদ্র্য বিমোচনে প্রতিটি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের অংশীদারিত্বের হিসাব দেওয়া হলেও কোন মন্ত্রণালয় কীভাবে এেেত্র ভূমিকা রাখবে সে ব্যাখ্যা দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। আবার দারিদ্র্য বিমোচনে নির্বাচন কমিশন, সংসদ বা সুপ্রিম কোর্টের মতো বিভাগগুলোতে বরাদ্দকৃত অর্থ আদৌ কোনও ভূমিকা রাখতে পারে কিনা_ সে প্রশ্নও অবান্তর নয়।
বাজেটে কর্মসংস্থানের জন্য ৯ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে বলে অর্থ উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন। এরমধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির ল্যে কয়েকটি ুদ্র কর্মসূচি পরিচালনা ও ুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা, ুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ প্রদানের ল্যে ঋণ তহবিল গঠন, সাময়িক বেকারত্ব মোচন তহবিল, কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ, আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুব উন্নয়ন, সাময়িক বেকারত্ব মোচন তহবিল, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পে ঋণ বিতরণ, ছাগল উন্নয়ন, পশুসম্পদ খাতে পুঁজি গঠন, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা ইত্যাদি পুরনো কর্মসূচিগুলো অব্যাহত রেখে এবার পল্লী অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ল্যে নতুন কর্মসূচিতে সাড়ে ৫শ' কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বরাদ্দকৃত এ অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং কোন কর্মসূচিতে কী হারে বেকারত্ব মোচন হবে_ সে ধরনের কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অর্থ উপদেষ্টা তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বাজেটে কর্মসংস্থানের ল্যে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয়েছে তাতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আগামী অর্থবছরে ৯৫ লাখ পরিবারের প্রায় তিন কর্মমাসের সমপরিমাণ শ্রম সৃষ্ট হবে। প্রশ্নসাপে হলেও প্রথমবারের মতো কর্মসংস্থানের পরিমাণ সম্পর্কে একটি ধারণা প্রদানের এ প্রয়াসের প্রশংসা করেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্র্য নিরসনের কাঠামোগত কোনও বিন্যাসও বাজেটে পরিলতি হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি_ কোথায়, কার মাধ্যমে, কোন প্রক্রিয়ায় হবে তার কোনও দিকনির্দেশনাও বাজেটে নেই বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে হলে সবার জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তবে গতানুগতিক প্রচেষ্টায় কর্মহীনতার এ সমস্যা সমাধান করা যাবে না। কারণ এ ধরনের প্রচেষ্টায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও তা চরম দরিদ্রকে স্পর্শ করতে পারছে না। এবারের বাজেটে অর্থ বরাদ্দের হিসাব দেওয়া হলেও ব্যয়ের পুরনো পন্থাই বজায় রাখা হয়েছে। ফলে সামগ্রিক বরাদ্দ শেষ পর্যন্ত দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা_ এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যেসব কর্মসূচিতে প্রত্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতার কারণে তা গরিব মানুষের কাছে পেঁৗছে না। তার মতে, অংকের হিসাবে যত বড় বরাদ্দই দেখানো হোক না কেন_ অর্থ ব্যয়ের গতানুগতিক কাঠামো বজায় রেখে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ইতিবাচক কোনও পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
|