|
গ্রামীণ অর্থনীতির রুগ্ন দশা
বন্যার প্রাদুর্ভাব সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে
বন্ধ হয়ে গেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য, দিনমজুরদের কাজ নেই, বাড়ছে বেকারত, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে দিশেহারা মানুষ, এডিপি বাস্তবায়ন গতিহীন, কৃষি ঋণ বিতরণে ভাটা ।
- রাজু আহমেদ / আজকেব কাগজ/ ৩০ জুলাই ২০০৭ |
|
গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম রুগ্ন অবস্থা বিরাজ করছে। অর্থপ্রবাহের উৎসগুলোতে নেতিবাচক পরিস্থিতি বিরাজ করায় সামগ্রিক অর্থনীতিতেই মন্দাভাব তৈরি হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়লেও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে গ্রামের মানুষের আয়ের পথ। নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে স্থবিরতার কারণে দিনমজুরদের হাতে কাজ নেই। কৃষি ঋণ আদায়ের বিপরীতে বিতরণ কমে যাওয়ায় গ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ শহরে চলে আসছে। নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য ুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। একইসঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিসঞ্চারের অন্যতম মাধ্যম এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গিন করে তুলছে। এ অবস্থায় বন্যার প্রাদুর্ভাব গ্রামের মানুষকে কঠিন সংকটে ফেলে দিয়েছে। দতার সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থ হলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
পরিসংখ্যান বু্যরোর হিসাবে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৫১ দশমিক ৬৯ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। বর্ষা মৌসুমে চাষাবাদ না থাকায় প্রতি বছরই এ বিপুলসংখ্যক কৃষি শ্রমিকের হাতে কাজ থাকে না। এ সময় শ্রমিকদের একাংশ গ্রামে অন্য খাতে কাজ খুঁজে নেয়। আর বড় অংশই কাজের জন্য শহরে কাজের পাড়ি জমায়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। গ্রামে কাজ নেই। রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রীসহ নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা অনেক আগেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অধিকাংশ এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়েব উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বড় নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখেছেন ভীত-সন্ত্রস্ত অনেক ধনী ব্যক্তি। মধ্যবিত্তের নগদ অর্থসঙ্কট ও নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যও নির্মাণ শিল্পে স্থবিরতার জন্য দায়ী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধিকাংশ ঠিকাদার গা ঢাকা দেওয়ায় সরকারি কাজেও মন্থর গতি বিরাজ করছে। সবমিলিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের এখন দুর্দিন চলছে। যেসব নারী শ্রমিক হোটেল বা বাসাবাড়িতে কাজ করত এখন সেখান থেকেও বিমুখ হচ্ছে তারা। রিকশা ও বস্তি উচ্ছেদের কারণে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ফিরে গেছে অসংখ্য রিকশাচালক। বস্তি উচ্ছেদ বাসাবাড়িতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের একাংশকেও গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।
বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের পাশাপাশি গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে হকারসহ শহরের কয়েক লাখ ুদ্র ব্যবসায়ী। এসব ুদ্র ব্যবসায়ী তাদের অর্জিত অর্থের বড় অংশই গ্রামে পাঠিয়ে পাঠাত_ যা গ্রমাীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। উচ্ছেদ অভিযানের কারণে এসব মানুষ গ্রামে ফিরে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর চাপ বেড়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রুগ্ন গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজন হলেও ধারাবাহিকভাবে কমছে ঋণ বিতরণ। শুধু তাই নয়_ ঋণ আদায়ের হার বৃদ্ধি করে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে নগদ অর্থ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বিতরণের তুলনায় কৃষি ঋণ আদায়ের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। পাশাপাশি ল্যমাত্রা অনুযায়ী, ঋণ প্রদানে ব্যর্থতা দেশের কৃষিখাতের একটি নিয়মিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসেবে বতর্মানে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের মাত্র ১২ শতাংশ কৃষিখাতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত (২০০৬-০৭) অর্থবছরে কৃষি খাতে মোট ৫ হাজার ২শ' ৯২ কোটি ৩০ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে_ যা আগের (২০০৫-০৬) অর্থবছরের তুলনায় ৪শ' ৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা কম। অন্যদিকে কৃষি ঋণ আদায় করা হয়েছে ৪ হাজার ৬শ' ৭৬ কোটি টাকা_ যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২শ' ৯৬ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ কৃষি ঋণ বিতরণ কমে গেলেও আদায়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৩শ' ৫১ কোটি ৩০ টাকার কৃষি ঋণ বিতরণের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এরচে' ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা কম বিতরণ করা হয়েছে।
অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ২ হাজার ৬শ' ৩২ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। এর বিপরীতে আদায় করা হয় ৪ হাজার ৭শ' ৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা প্রত্যাহার করা হয়। বিতরণের তুলনায় আদায়ের হার বেশি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে অর্থের গ্রামমুখী প্রবাহ বন্ধ করে শহরমুখীনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। এ সম্পর্কে কৃষি ব্যাংকের একজন ঊধর্্বতন কর্মকর্তা বলেন, গত ২ বছর ধরে কুঋণ আদায়ে জোর প্রচেষ্টার কারণে বিতরণের তুলনায় আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের কারণে সম্পদ আটকে থাকায় এ অর্থ পুনরুদ্ধার ছাড়া কৃষিঋণ বিতরণের গতি বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
এদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যর্থতা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত অর্থবছরের (২০০৬-০৭) এডিপিতে বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ৪৫ শতাংশ সরাসরি গ্রামাঞ্চলে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সংশোধিত এডিপির মাত্র ৬১ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে_ যা মূল এডিপির ৫১ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও সামগ্রিকভাবে তা ৭০ শতাংশের বেশি হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। আবার শহরকেন্দ্রীক প্রকল্প বাস্তবায়নের হার বেশি থাকায় গত অর্থবছরের এডিপিতে গ্রামীণ অর্থনীতির অংশীদারিত্ব খুবই কম ছিল বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের বড় মাধ্যম এডিপি। কিন্তু এডিপিভুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির েেত্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য বেড়ে যেতে পারে। তাদের মতে, জাতীয় উন্নয়নে শহর ও গ্রামের মধ্যে সীমাহীন বৈষম্য বিরাজমান থাকায় গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মানুষই সারা বছর কাজ পায় না। ফলে বেশির ভাগ সময় তাদেরকে বেকার হয়ে বসে থাকতে হয়। এ অবস্থায় এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি গ্রামীণ দারিদ্র্যকে আরও প্রকট করে তুলবে।
বিদু্যৎ ও জ্বালানি সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, অনুন্নত অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির অভাব, পণ্য বাজারজাতকরণজনিত সমস্যা এবং আমদানিকৃত বিদেশী পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার কারণে চরম সংকটের মুখে পড়েছে গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠা ুদ্র ও মাঝারি শিল্প। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে গ্রামীণ হস্ত ও কুটির শিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার েেত্র ুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা অন্যতম চালিকা শক্তি বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। কিন্তু সরকারি সহায়তার অভাবে গত ৫ বছরে এ খাতের কয়েক লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে হাট-বাজার উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান সরকার মতা গ্রহণের পর উচ্ছেদ কার্যক্রমের আওতায় দেশের প্রায় সব জেলায় গ্রাম পর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানে হাট-বাজার থেকে শুরু করে রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা ছোট দোকানও উচ্ছেদ করা হয়। এর ফলে একদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার পথ বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রচলিত বাণিজ্য ব্যবস্থা। দোকান মালিক, কর্মচারী, পণ্য উৎপাদক, সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন স্তরের বাণিজ্যে জড়িত লাখ লাখ মানুষ তিগ্রস্ত হয়েছে।
বিভিন্ন অঞ্চলে বৃহৎ শিল্প কারখানা বন্ধও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন স্থানে কাজ নিতে শুরু করে। ফলে বাজারে শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আগের তুলনায় কাজ কমে গেছে। সামগ্রিকভাবে গত কয়েক মাসে গ্রামাঞ্চলে বেকারের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। মানুষের হাতে কাজ না থাকলেও দ্রব্যমূল্যের ঊধর্্বগতির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম সংকট। এক বছর আগে যে পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য কিনতে ১শ' টাকা লাগতো সরকারি হিসাবেই তা কিনতে এখন লাগছে ১শ' ৯ টাকা ৮০ পয়সা। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত বছরের জুনের তুলনায় গত জুনে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর জুলাই মাসে যে হারে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি দু' অংকের কোঠা ছাড়িয়ে গেছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। শুধু অতি নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল, লবণ ও মসলার মূল্যবৃদ্ধির হিসাব করলে গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য মূল্যস্ফীতির চাপ আরও অনেক বেশি। খাদ্যদ্রব্যের এ মূল্যবৃদ্ধি গ্রামের মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে।
এদিকে দেশের অধিকাংশ জেলায় আঘাত হেনেছে বন্যা। ইতিমধ্যেই মাঠের ফসল, রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, গবাদিপশুসহ জানমালের ব্যাপক য়তি সাধিত হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় সরকারের পরিকল্পিত পদপে ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম আজকের কাগজকে বলেন, এই মুহূর্তে গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রার জন্য সবচে' জরুরি বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা। ত্রাণ কর্মসূচি জোরদার করে বন্যার্ত মানুষকে বাঁচানোই এখন বড় কর্তব্য। এজন্য সরকারকে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। বন্যার পর প্রথম কাজ হবে নষ্ট হয়ে যাওয়া জমিতে কৃষক যাতে দ্রুত ফসল লাগাতে পারে তার ব্যবস্থা করা। একইসঙ্গে ব্যাপকভিত্তিতে ভিজিডি ও ভিজিএফ কর্মসূচি শুরু করতে হবে। তিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাটসহ অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
তিনি বলেন, গ্রামসহ সারা দেশের গরীব মানুষকে বাঁচাতে সরকারকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্রব্যমূল্য কোনওভাবেই যেনো লাগামছাড়া না হয়_ সেদিকে নজর রাখতে হবে।
|
|
|
|
|