|
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল প্রায় দেড় লাখ জেলের জীবন ও জীবিকার কোন পরিবর্তণ নেই
- রকিব উদ্দিন পান্নু / সংবাদ, খুলনা |
|
"ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে। এখানে তাকে খুজে পাওয়া যাবেনা"। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসে পদ্মাপাড়ের কেতুপুর গ্রামের জেলেপল্লীর দারিদ্র, দুঃখ, দুর্দাশার, বঞ্চনা আর কষ্টের করুণ চিত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এমন একটি বর্ণনা দিয়েছিলেন। মানিকের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের জেলেপল্লী সেই কেতুপুর গ্রামের অবিকল প্রতিচ্ছবি যেন সন্দরবন ঘেষা প্রতিটি জেলেপল্লীতে। এখানেও আছে নিঃস্ব জেলে কুবের ও গনেশ। আছে নৌকার মালিক ধনঞ্জয়, চোরাকারবারি হোসেন মিয়ারও অভাব নেই। শীতল, রাসু, পীতম মাঝি, গোপী, যুগীও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
নানা প্রতিকূলতায় বিধস্ত, বিত্তশালীদের অত্যাচারে জর্জরিত, দারিদ্রকিষ্ট, রোগাক্রান্ত এ জেলে পাড়ার বাসিন্দারা আধুনিক সমাজের রাষ্ট্রিয় সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারের নানা পরিকল্পনা, আন্তজার্তিক সাহায্যপুষ্ট এনজিওদের নানা কার্যক্রম তাদের ভাগ্য ফেরাতে পারেনি। দীর্ঘদিনেও সুন্দরবন ঘেষে দেড়লাখ জেলের জীবন ও জীবিকার কোন উন্নয়ন নেই। সরকারের দারিদ্র বিমোচন কৌশল পত্রে এদের নিয়ে নানা পরিকল্পনা থাকলেও তা শুধু কাগজেই। সরকার তার প্রণীত পিআরএসপিতে জলের ওপর দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা পরিকল্পরার কথা বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে। তবে সেই সব পরিকল্পনা সবই আবদ্ধ হয়ে আছে এ সমপ্রর্কিত প্রকাশিত গ্রন্থের কালো রঙ্গের অরগুলোর ভেতরেই।

প্রস্থের বিশালতা ধারণ করে দুকুল ছাপিয়ে সাগরে বহমান শিবসা, একপাশে সুন্দরবন অপর পাশে দিগন্ত ছোয়া মাছের ঘের, বিশাল লোকালয়। লোকালয়ের শেষ প্রান্তে, শিবসার তীরে ওয়াপদার রাস্তার ভেড়ীতে সারিসারি ঘরতুলে বসত গড়েছে জেলেরা। নদীতীর ছুয়ে ওয়াপদা রাস্তার জেলেপলী্ল অথবা জেলে পাড়া না বলে জেলেদের বস্তির দীর্ঘ সারি বললেই বেশী যুতসই হয়। বৈশাখ জৈষ্ঠ্যে শিবসায় ঢেউ এর আকার একটু বড় হলেই মুছে যায় সেই বস্তি। থেমে যায় শতশত জীবনের নিরন্তর সংগ্রাম। এমন শতশত জেলে পল্লী রয়েছে দাকোপ পাইকগাছা, গরুই খালী, বরদল, কয়রায়। এসব জেলের জীবীকার অন্যতম উৎস সুন্দরবন সংলগ্ন অসংখ্যা নদী ও এর খালগুলো। বড়বড় নদীগুলোতে এদের এখন আর মাছ ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা নেই। লীজ বা ইজারা প্রথার কারণে ছোট নদী ও খালগুলোতে তাদের নেই কোন প্রবেশাধিকার।
বন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, পৃথিবীর ৫,৭১৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ এ সুন্দরবন মূল্যবান প্রানীজ, জলজ ও বনজ সম্পদের বিশাল আঁধার। একই সাথে সুন্দরবন লাখ লাখ মানুষের জীবন জীবিকার উৎস হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রতিবছর সুন্দরবন থেকে বাওয়ালীদের কাঠ ও ও মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ ছাড়াও গড়ে ৮০ হাজার মন সাদা মাছ, ১০ হাজার মন বড় চিংড়ি, ৩০ হাজার মন ছোট চিংড়ি, ১৬ হাজার মন শুটকি, ১৫ হাজার মন ইলিশ, ৩ হাজার মন কাঁকড়া, ২০ কোটি বাগদা পোনা আহরন করা হয়। বনজ সম্পদ আহরনের মাধ্যমে সুন্দরবন ঘেষা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তাদের জীবিকা অর্জন করে।
উপকুলীয় উন্নয়ন সহযোগী'র পরিচালক আশরাফ উল আলম টুটু জানিয়েছেন, জীবিকার জন্য সরাসরি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৬ লাখ বিভিন্ন শ্রেনীর পেশাজীবী। এর মধ্যে জেলের পরিমান প্রায় দেড় লাখ। নানা কারণে এদের জীবিকা এখন হুমকির সম্মুখিন। সুন্দরবন ঘেষা সাতীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পিরোজপুর জেলার উপকুলবর্তী এলাকার ভুমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠির জীবন ও জীবিকার উৎস সুন্দরবন। সহায় সম্বলহীন ওই মানুষেরর কিছু অংশ জীবনের চাহিদা মেটাতে জেলের পেশা বেছে নেয়। কোন নীতিমালা না থাকায় এসব মৎস্যজীবীরা বেশিরভাগ েেত্র ধনী ব্যবসায়ীদের নৌকায় দিন মজুরের ভিত্তিতে সুন্দরবনে জেলের পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এদের প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে, পেশাগত দতা ও প্রশিনের অভার, আনুসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, রেডিও সিগন্যাল, বাতিঘর, দিকদর্শণ যন্ত্র, ঔষধপত্র, খাবার পানি, আড়ৎদার, মহাজন ও ফরিয়াচক্র এবং দাদন ব্যবসায়ীদের শোষন ও বঞ্চনা। জলদসু্য ও ডাকাতদের উপদ্রব, বনবিভাগের চাঁদাবাজী, প্রভৃতি। একটি নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের জীবন কতটুকু নিশ্চয়তাহীন ও অমানবিক হতে পারে উপকূলীয় এলাকার মৎস্যজীবীরা তার উজ্জলতম উদাহরণ। এসব মৎস্যজীবীর অভাব আর দারিদ্রই হয় স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠির শোষকের মুলপুজি।
আশরাফ উল আলম টুটু আরও জানান, জীবনের ঝুকি নিয়ে সুন্দরবনে যায় যেসব জেলে তাদের জীবনের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা থাকেনা। প্রাণহানী হলে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে নেই তিপুরণের কোন ব্যবস্থা। বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার পশুরনদীর চরের কানাইনগর গ্রামের বাসিন্দা গগন। তার ছোটভাই জগদীশ, বড়ভাই অসীম পৃথক পৃথক সময়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমনে নিহত হযেছে। গগণের ভাই ও পিতার বাঘের আক্রমনে নিহত হওয়ার এমন উদাহরণ রয়েছে শতশত। সুন্দরবনে বনজীবীদের ওপর হামলা শুধু বাঘই করেনা। আছে আরও নানা ধরণের হামলাকারী। কতিপয় দুর্ণীতিবাজ বনকর্মকর্তা। বনদসু্য, স্থাণীয় ফাড়ির দুণর্ীতিবাজ কর্মকর্ত। কেউ হামলা করে প্রাণের ওপর, কেউবা রুজীর ওপর। আবার কখনো প্রকৃতি তাদের ওপর নির্দয় ভাবে হামলে পড়ে। সুন্দরবন সংলগ্ন জেলেপল্লী গুলোতে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় প্রতি বছর ঘুর্ণিঝড় জলোচ্ছাসে বেঘোরে প্রাণ হারায় শত শত জেলে।
এদিকে স্থানীয় একটি সুত্র জানায়, সুন্দরবন সংরন ও সুন্দরবনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সৃষ্টির মাধ্যমে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল পেশাজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরেই কাজ করছে। বিদেশী দাতা সংস্থার তহবিলে তাদের নানা প্রকল্প চলছে। সুন্দরবনের ওপরে সরাসরি নির্ভরশীল দরিদ্র, হতদরিদ্র ও আদিবাসী (মুন্ডা-মাহাতোঁ) শ্রেনীকে বিভিন্ন হয়রানি-শোষণ থেকে মুক্তি, তাদের অধিকার সম্পর্কিত আইনি সচেতন এবং সকল অধিকার আদায়ে সাংগঠনিকভাবে সমতা বৃদ্ধির ল্যে এই প্রকল্প গুলোর কাজ শুরু হয়। বাওয়ালী-মাওয়ালী-মৎস্যজীবীরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা, বনজ সম্পদের বিধি সম্মত আহরন ও লট বিডিং-এ অংশগ্রহনের সুযোগ, লট বিডিং-এর পদ্ধতিতে পরিবর্তন, বন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা, সম্পদ আহরনকালীন সময় অসাধুতা, বনদসু্য-জলদসু্যদের অত্যাচার, ফড়িয়া-দাদনদার-মহাজনদের শোষনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার ল্যে তারা বনজীবীদের সচেতন করে তুলতে নানা কর্মসুচি চালু করে। তবে তাদের গৃহিত কর্মসুচী কতটা সফল তা মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
দাকোপ উপাজেলার শিবসা, ঢাকি ভদ্রা নদী বেষ্টিত দাকোপের ৩২ নং পোলন্ডার কে ঘিরে রয়েছে চতুর্থ মৎস্য প্রকল্প। এই প্রকল্পে ভুমিহীন, প্রান্তিক চাষি তথা দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। নলিয়ান নদীর তীরবর্তী প্রায় ৫০০ ভুমিহীন পরিবারকে এ কার্যক্রমে অংশগ্রহনের সুযোগ দিয়ে তাদের ভাগ্য উন্নয়নে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এটা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা পর্যবেনের দাবি রাখে।
দাকোপ উপজেলার কালাবাগি গ্রামের সাইকোন সেল্টারের পাশেই সরকারি জমিতে ছোট্ট একটু কুড়েঘরে বসত গেড়েছেন আহম্মদ শেখ। শিবসার ভাঙ্গনে তার ১০ বিঘা জমির ভিটেবাড়ি বিলিন হয়েছে। প্রায় ১৩ বছর ধরে সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। দাদন নিয়ে নৌকা ও জাল কিনেছেন। জানালেন , ৩২ নং পোল্ডারের সরকারি খাস জলাশয়গুলোতে প্রবেশাধিকার শুধু জোতদার মহাজন প্রভাবশালীদের। ওটার মালিক হক সাহেব। হক সাহেব এলাকার একজন প্রভাবশালী লোক। একটি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি তিনি। ওখানে তারমত হতদরিদ্র জেলেদের কোন অধিকার নেই।
কয়রা উপজেলা সদরের ৫নং ভেড়িবাধে বসত গড়েছেন রফিকুল। তিনি মাছ ধরেন সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে। শহরের মহাজনেরা পাশপারমিট নিয়ে আসে। তারা দিনমজুর হিসেবেই জঙ্গলে মাছ ধরেন। জঙ্গলে চার পেয়ে বাঘের চেয়ে বেশী ভয়ঙ্কর দোপেয়ে বাঘ। অর্থাৎ জলদুস্যরা। তাদেরকে চাঁদা না দিলে প্রাণে বাচাঁ যায়না।
দাকোপ উপজেলার কালা বগি গ্রামের নেছার থাকেন ভেড়িবাধে ঘর তুলে। সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে মাছ ধরেন। দাদন নিয়ে জাল ও একটি ছোট্ট নৌকা কিনেছেন। সারাদিন জঙ্গলে মাছ ধরে তার পুরো সুফলটা নিজের ঘরে তুলতে পারেনা। লাভের ভাগ দিতে হয় নানা ঘাটে।
একই কথা বলেছেন, শিবসা নদীর তীরে ভেড়িবাধে বসবাসকারি আকরাম আলী। নদীভাঙ্গনে সবসর্্ব হারিয়ে তিনি ৩০ বছর ধরে জেলের পেশায় নিযোজিত রয়েছেন। তিনি কোন ভুমিহীন সমিতির সদস্য নন। নানা ঘাটে চাঁদা দিয়ে তাকে বড় নদীতে মাছ ধরতে হয়। ছোট নদী এবং বেড়িবাধের ভেতরের সরকারি খাস জলাশয়ে তার কোন প্রবেশাধিকার নেই। কালাবগির ওই জেলেপলি্লতে এ ধরণের অসংখ্য ভুমিহীন জেলের খোজ পাওয়া গেছে, যারা কোন সমিতির সদস্য নয়। আবার এই ভেড়িবাধ ঘিরেই অনেক সাইনবোর্ড রয়েছে বিভিন্ন মৎস্যজীবি সমিতির। স্থানীয় সকল খাল ও নদীর ওই সব সমিতির নামে ইজারা নেয়। যাদের কর্মকর্তা শহুরে কিছু প্রভাবশালী এবং স্থানীয় ভুস্বামী।
সুন্দরবন সংলগ্ন সরকারি খাস জলাশয়গুলোতে ভুমিহীনদের কোন অংশগ্রহণ নেই এ কথা অস্বীকার করেছেন ৩২ নং পোল্ডার পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক খান মোহাম্মদ কবির হোসেন। যিনি এলাকায় কবির খা হিসেবেই পরিচিত। তিনি জানিয়েছেন, এ প্রকল্পের প্রতিটি ব্লকেই ২৫ জন করে নলিয়ান তীরবর্তী মোট ৫শ' ভুমিহীন পরিবারকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা শুধু মাত্র প্রভাবশালীদের দ্বারা পরিচালিত নয়। ৩২ নং পোল্ডারের ভেতরে মোট ৮ হাজার ১০০ টি পরিবারের মধ্যে ভুমিহীন পরিবার ১৮ শ' এবং ধনী পরিবার ৮শ'।
শুধুই সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলো নয়, এ অঞ্চলের কোন নদীর ওপরই জেলেদের অধিকার নেই
শুধু সুন্দরবন সংলগ্ন নদনদী নয়। খুলনা জেলার সকল এলাকায় জেলেরা মুক্ত জলাশয়ের প্রতি তাদের অধিকার হারিয়েছে। খুলনাঞ্চলের ওপর দিয়ে ৭৮ টি শাখা ও উপনদী প্রবাহিত। যার মধ্যে ৫৮ টি শাখা নদী ও ২০টি উপনদী রয়েছে। এ সমস্ত নদনদীর সাথে এ অঞ্চলের জীবন ও জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এ সব নদনদী অধিকাংশই সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে লিজ দেয়া হয়েছে। এতে উম্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরা তথা জাল ফেলার অধিকার হারিয়েছে হাজার হাজার জেলে।
কয়রা উপজেলার ৯টি নদী ইজারা দেয়া হয়েছে প্রভাবশালীদের কাছে। এছাড়া হড্ডা হোগলা খাল, আমতলা কেওড়কাঠি খাল, খোড়লকাঠি খাল, কয়রানদী, নারায়নপুর খাল, হোগলার চরদুয়ানী খাল, দনিবেদকাশির বেতবুনিয়াখাল, আমাদি বদ্ধ জলমহল স্লুইচ গেটের খাল ২৪ টি খাল গুলোতে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার অধিকারতো দুরের কথা প্রভাবশালীদের এতই দাপট যে, সাধারণ মানুষ ওইসব নদীর পাশদিয়ে হাটতে গেলেও বাধাগ্রস্ত হন। লবনপানি আটকাতে নদীর বিভিন্ন অংশে বাধ দিয়ে তার স্বাভাবিক চলার পথকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে লবনাক্ততা এবং জলাবদ্ধতার।
খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার জেলেদের নিয়ে কাজ করছে সমাজ প্রগতি সংস্থা। এ সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক আলমগীর ইসলাম লাবলু বলেছেন এ অঞ্চলের নদনদী ও জলাশয় গুলো নিয়ে অপরিকল্পিত নানা ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত ড্রেজিং এর অভাব, স্লুইস গেট নিয়ন্ত্রনে অব্যবস্থাপনা, ব্রিজ ও সাকো নির্মান, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালীর বর্জ নিপে এবং অবৈধ নদী দখল ও লীজ প্রদানের কারনে এ অঞ্চলের জেলেরা নদীতে জলাশয়ের ওপর তাদের অধিকার হারাচ্ছে। প্রধান নদীগুলো এখনও সাধারণ জেলেদের জন্য কিছুটা উম্মুক্ত থাকলেও ছোট ছোট নদী ও খাল গুলোর ওপর থেকে সাধারণ জেলেরা তাদের অধিকার হারিয়েছে। ভুমিহীন ও জেলেদের নানা সমিতির নামে ছোট ছোট নদী ও খাল ইজারা বা লীজ দেয়া হলেও এর মূল মালিক ধনী এবং বিত্তবানরা। এ অঞ্চলের সকল লীজ বাতিল করে জেলে ও দরিদ্র জনগোষ্ঠির ব্যবহারের জন্য নদী ও জলাশয় গুলোকে উম্মক্ত করে দিলে জেলেরা তাদের স্বাভাবিক অধিকার ফিরে পাবে।
বটিয়াঘাটা উপজেলার ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে র বটিয়াঘাটা উপজেলার বিভিন্ন নদী ও জলাশয় গুলোকে ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদী লীজ দেয়া শুরু করে। ভুমিহীন ও জেলে সমপ্রদায়রে বিভিন্ন সমিতির নামে এসব নদী লীজ দেয়া হলেও বাস্তবে ধনী বিত্তবান ও প্রভাবশালী লোকেরা লাভবান হচ্ছে। তিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার জেলে। বটিয়াঘাটায় ময়ুরনদী, পশুর নদী, নালুয়া নদী, কাটাখালী নদী, ফুলতলা নদী, আলুতলা খালসহ প্রায় ৪০টি খাল বিভিন্ন মৎস্যজীবি সমিতির নামে লীজ দেয়া হয়েছে । সাধারণ হতদরিদ্র জেলে সমপ্রদায়ের ওই সব সমিতিতে কোন সদস্যপদ দেয়া হয়না। সমিতিগুলোর মুল নিয়ন্ত্রক হন এলাকার প্রভাবশালী গোষ্ঠি। হতদরিদ্র সাধারণ জেলে গোষ্ঠি এইসব মৎস্যজীবি সমিতির দিনমজুর মাত্র।
সরকারি খাস জলাশয়ে সাধারণ জেলেদের অধিকার হারানো প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগীয় মৎস্য উপপরিচালক জয়দেব কুমার বিশ্বাস বলেছেন, উম্মুক্ত জলাশয়ের ওপর হতদরিদ্র জেলে সমপ্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা রয়েছে। এলাকা ভিত্তিক বিভিন্ন মৎস্য কর্মসুচী চালু হওয়ার সময়ে এসব নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলেও কিছুদিনের ব্যবধানে তা গোলমাল হয়ে যায়। কাগজপত্রে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে এলোমেলো হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আরও যুগোপযুগি কঠোর আইনের প্রয়োজন।
সরকারের প্রনীত পিআরএসপিতে রয়েছে জেলেদের ভাগ্যের উন্নয়নে নানা কথামালা, মৎস্য বিভাগ জেলে ও কমিউনিটির অংশগ্রহনের মাধ্যমে নদী নালায় মাছ চাষ উৎসাহিত করবে । জাতীয় মৎস্য নীতিমালা তৈরি করা হবে, যাতে দরিদ্র ও জেলে সমপ্রদায়কে গুরুত্ব দেয়া হবে। তবে সবই রয়েগেছে কাগজে। জেলে পরিবারের শিশু কিশোর থেকে বৃদ্ধের সারা বছরের কঠোর পরিশ্রম তাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেনা। যেন " জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ুদা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সংকর্ীণতায়" -জেলেদের ভাগ্যবদলে নিয়োজিত পরিকল্পনাবিদদের ভ্যাগ্য বদল হলেও চিরাচরিত ভাবেই জেলেদের জীবন বদলায় না।
|
|
|
|
|