|
জীবন বাঁচাতে জীবনকেই বাজী রাখে উপকুলের ভূমিহীনরা
- রকিব উদ্দিন পান্নু / সংবাদ, খুলনা |
|
জীবন বাঁচাতে জীবনকে কতটা ঝুকির মুখে ঢেলে দেয় উপকূলীয় ছিন্নমুল মানুষেরা তা নিজ চোখে না দেখলে অনুভব করা কঠিন। লোনা পানির বিশাল শিবসার তীরে ভাঙ্গন কবলিত ভুমিহীনরা স্ব-পরিবারে প্রতিনিয়ত মৃতু্য ঝুকির মধ্যে বসবাস করছেন। এদের দুদর্শাকে পুঁিজ করে গড়ে ওঠা বেশ কিছু সমিতি সংগঠন এর কর্তা ব্যক্তিরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও ভুমিহীনরা রয়ে যাচ্ছে সেই তীমিরেই।
ভাঙ্গন কবলিত বিশাল শিবসা'র তীরে তারা সারিসারি টংঘর বেধে জীবন যাপন করে নদীর জলে ঘর হারানো মানুষেরা। বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে তারা থাকে সেখানেই। একটি বড় ঢেউ মুহুর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে তাদের ছোট্ট্ সংসারের সবকিছু। এক পাশে ঘন জঙ্গল সুন্দরবন। সেখানে বাঘ, বুনো হিংস্ত্র জানোয়ারের নিত্য আনাগোনা। নিচে শিবসার অথৈ জলে কুমির, কামোটের অভাব নেই। চারপাশে নানা ধরণের বিপদের হাতছানি। তার ভেতরেই বেঁেচ থাকার অদম্য স্পৃহা নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনে যায় তারা।

নদীর তীরে টংঘর করে কারা থাকে। মানুষ কতটা নিরুপায় হলে এমন বিপদসংকুল জায়গায় বাঁচার আশায় ঘরবাধে। সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় অভাবী খেটে খাওয়া মানুষ গুলোর মুখেই। বাসস্থানের অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব, সর্বোপরি অভাবের তাড়না, ুদার কষ্ট তাদেরকে এখানে থাকতে বাধ্য করেছে। শিবসার জলে পৈত্রিক ভিটা হারিয়ে তারা মাথা গোজার ঠাই হিসেবে বেছে নিয়েছে ঘর বেধেছে শিবসার তীরেই।
ভূমিহীন আকরাম আলী মাছ ধরেন শিবসা নদীতে। এক সময়ে তার বিশাল জমি জিরাত ছিল। এখন শিবসার ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারিয়ে বসত গেড়েছেন ভেড়িবাধের ওপরে। বললেন এই কালাবগিতে হাজার হাজার বিঘা সরকারি খাস জমি থাকলেও তাতে ভূমিহীনদের কোন জায়গা নেই। সেখানে প্রভাবশালীরা লিজ নিয়ে মাছের ঘের করেছে। সর্বস্ব হারানো ভূমিহীনদের জীবনের ঝুকি নিয়ে থাকতে হয় নদীর ওপরে মাচা বেধেই।
বাংলাদেশে মানচিত্রে খুলনা জেলার অবস্থান দেিন। এ জেলার মানচিত্রের মাঝ বরাবর উত্তর থেকে দেিন একটি বিশাল নদী সাগরে মিশেছে। নাম তার শিবসা। বিশাল তার অবয়ব। শীতে তার বুকে কোন ঠেউ খেলে না। যেন একদম শান্ত স্বাভাবিক। তবে বৈশাখ এলেই পাল্টে যায় তার সেই রূপ। ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে সে। আশেপাশের সবকিছু ভেঙ্গেচুড়ে সাগরে নিয়ে যায়। এক তীরে তার সুন্দরবন অন্য তীরে লোকায়ল।
খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার সুতার খালী, কালাবগি, কামার খোলা তিলডাঙ্গা, কয়রা উপজেলার গড়াইখালী, ষোলদানা, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নগুলোর বুক চিড়ে শিবসা মিলেছে বঙ্গপসাগরে। সে তার যাওয়ার পথে রেখে যায় অনেক চিহ্ন। সেগুলো একধারে সৃস্টি অবার ধংসের। শিবসা তার এক তীর ভাঙ্গে, অপরতীরে জাগিয়ে দেয় বিশাল চর। ভাঙ্গা গড়ার এই খেলা চলছে তার চিরন্তন গতিতে। শিবসার ভাঙ্গনে নিঃশ্ব হয় হাজার পরিবার। ভাঙ্গনে সহায় সম্বলহীন ওই মানুষেরা আবারও ঘরবাধে শিবসার তীরে। ভুস্বামীদের রক্ত চুকে এড়িয়ে বেড়িবাধের কোলে। পাঁচফুট বাই সাতফুট অথবা দশ থেকে বারো ফুট। এক একটি ঘরের আকৃতি। টংঘরের মতই, গুটি কয়েক সুন্দরী ও অথবা কেওড়া গাছের খুটির ওপরে গড়া পাটাতন। তার ওপর গোলপাতার ছাউনি রোদ বৃষ্টি সামলানোর নিরন্তন প্রচেষ্টা। সেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যদুতের মত হানা দিয়ে শিবসার বিশাল ঢেউ এসে আছরে পড়ে। টংঘরের নিচে ফনা তোলা ঢেউ ফোসফাস করে নাগিনীর মতই। বেচে থাকার তীব্র আকুতি নিয়ে সেখানে নতুন সংসার বাধে তারা। হাসি কান্নার ভেতরেই নবযাতক জন্ম নেয়। আশা, শুধুই কোন রকমে বেঁেচ থাকা। সুন্দর কোন স্বপ্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে তারা। শুধুমাত্র দাকোপ উপজেলার সুতারখালী এবং কালবগি এলাকাতেই শিবসার তীরে টংঘর করে বসবাস করছে প্রায় দুই হাজার ভুমিহীন পরিবার। টংঘরের ভেতরেই তাদের রান্না-খাওয়া, পয়ঃপ্রণালী, হাসি কান্না সবকিছু। আয়ের প্রধান উৎস শিবসায় মাঝ বরাবর নৌকা নিয়ে জাল ফেলে মাছের অপোয় থাকা। অবশ্য সে নৌকা, জাল সবই থাকে মহাজনের। কখনও এরা সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালীদের সহকারি হওয়ার পেশাও বেঁছে নেয়। শিা, স্বাস্থসেবাসহ আধুনিক নগর জীবনের সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত এ মানুষেরা জানেনা মৌলিক অধিকার কি। চরম দারিদ্র তাদেরকে শুধু অসেচতন করেই রাখেনি। পিছিয়ে রেখেছে, আধুনিক গ্রাম্যসভ্যতা থেকেও বহুদুর। স্থানীয় ভূমিহীন
শিবসার তীর ঘেরে নির্মিত শতশত এ টংঘরের বিশাল সারির পাশেই দিগন্ত বিস্তৃত ভুমি। সেখানে দিগন্ত ছোয়া হাজার বিঘা জমির মাছের ঘের। অধিকাংশ খাস জমি হলেও সেখানে ভুমিহীনদের কোন জায়গা নেই। সেখানে রাজত্ব শুধু ভুস্বামীদের। ভুমিহীনদের পুঁিজ দুর্দশাকে পুঁিজকরে গড়া হয়েছে বেশ কিছু সমিতি সংগঠন। এগুলোর নামেই হাজার বিঘার সরকারি খাস জমির দখল নিয়ে গড়ে হয়েছে দিগন্ত বিসৃস্ত আকাশ ছোয়া লোনা পানির মাছের ঘের। হাজার কোটি টাকার কথিত সাদাসোনার আবাদ। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয় কিছু শহুরে টাউট বাটপার। তাদের পেছনে থাকে উচ্ছিষ্ট ভোগী কিছু গ্রাম্য সহযোগী।
|
|
|
|
|