|
সরকারি কোন প্রচেষ্টা নেই: নিস্বঃ হচ্ছে মানুষ
খুলনার বিভিন্নস্থানে নদীতীর ভাঙ্গছেই :
- রকিব উদ্দিন পান্নু / সংবাদ, খুলনা |
|
ভাঙ্গন প্রতিরোধে যথাসময়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামবাসির আশঙ্কাই সত্যি পরিনত হলো। প্রবলস্রোতের চাপে খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নদনদী ভাঙ্গছেই। প্রতিদিন আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছেন বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙ্গন কবলিত মানুষেরা।
সংশ্লিষ্ট একটি সুত্রে জানা যায় , রূপসা, ভৈরব, শিবসা, পশুর, কপোত, শাকবাড়িয়া ও আঠারোবেকি নদীর পানি প্রবাহ বর্ষা হলেই বিপদ সীমার কাছাকাছি চলে যায়। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে ২ দশমিক ৫৯ সেন্টিমিটার অতিক্রম করলে সেই পানি প্রবাহকে বিপদসীমা অতিক্রম বলে ধরা হয়। চলতি জুলাই মাসে প্রথম তিনদিন খুলনার নদীগুলোতে পানি প্রবাহের সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ২৯, ১ দশমিক ৯৩ ও ২ দশমিক ৩২ সেন্টিমিটার। আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং পূর্ণীমা ও অমাবশ্যায় জোয়ারের গোনে পানি বিপদসীমার কাছা কাছি চলে আসে।
প্রত্যদর্শীরা জানায়, গত ২০ আগষ্ট শনিবার বিকেল তিনটায় জোয়ারের প্রবল স্রোতে ২৯ জালিয়াখালি গ্রামের ভেড়ীবাধ ভেঙ্গে যায়। জোয়ারের পানিতে ওই এলাকার পাচঁটি গ্রাম তলিয়ে যায়। শতাধিক চিংড়ি ঘের, পুকুর এবং ফসলী জমি ভেষে যায়। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে প্রায় তিনশ পরিবার। মাত্র পনের দিন আগেও আরও একবার ভদ্রা নদীর ভাঙ্গনে ডুমুরিয়ার জালিয়াখালী প্লাবিত হয়েছিল। তবে সেবার অমাবশ্যা বা পূর্ণীমা না থাকায় তেমন কোন য়তি হয়নি। ভেড়িবাধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়া জালিয়াখালি, চাঁদগড় বাড়োয়াড়িয়া, সুন্দরমহল, শম্ভুুনগর ও ভুলবাড়িয়া গ্রাম গত শনিবার রাতে পরিদর্শন করেছেন পাউবো খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মালেক। তিনি জানান, অর্থ বরাদ্দের অভাবে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় কাজ করা যাচ্ছে না। এ বছরে ভেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য কোন অর্থ বরাদ্দ হয়নি। এছাড়া বিকল্প ভেড়িবাঁধ নির্মানের জন্য জমি অধিগ্রহনের কোন ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি।

এদিকে জেলার দাকোপ উপজেলায় পশুর ও শিবসা নদীর জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গতকাল রোববার সকাল থেকে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসসহ সুতারখালি, নলিয়ান, কালাবাগি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। এ তিন গ্রামের কয়েকশত বিঘা আমন ধান এখন পানির নিচে। জোয়ারের পানিতে ৩০/৩৫ টি পুকুর ও দেড় শতাধিক চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। উপজেলার চালনা পৌরসভা এলাকায় পশুর ও শিবসা নদীর জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় আট গ্রামের কয়েকশত একর আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। দেড় শতাধিক ছোট বড় পুকুর ও ৩০/৩৫ টি মাছের ঘের ভেসে গেছে। ভাঙ্গনের কবলে খুলনা দাকোপ সড়কের একাংশ নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজও পানখালি এবং চুনকুড়ি নদীর ভাঙ্গনের হুমকির মুখে রয়েছে। দাকোপের পানখালি সাইকোন সেল্টারের মোড় থেকে উপজেলা সদরের ৩১, ৩২ এবং ৩৩ পোল্ডারের বেশ কয়েক জায়গায় এমন ভাবে ভেঙ্গেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই এক সময়ে সেখানে দাকোপ খুলনা মহাসড়ক ছিল। সেই ভাঙ্গনের মোকাবেলা করে আজ অবধি দাকোপ-খুলনা সড়ক চালু করা যায়নি। দাকোপের খলিসা, পানখালি, মৌখালি, লীখোলা, ঘোনা, ঝালবুনিয়া, কামিনিবাসিয়া, কালাবগী সাইকোন শেল্টার, নলিয়ান বাজার, সুতারখালি, কামারখোলা, গুনারি, পোদ্দারগঞ্জ, চুনকুড়ি, আমতলা, বানিয়াশান্তা, ঢাংমারি ইত্যাদি এলাকা ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে। এসব এলাকার লোকজন অন্যত্র সরে যাচ্ছে। ভাঙ্গনের মুখে রয়েছে আমতলা পুলিশ ফাঁড়ি। নলিয়ান বাজার, ৯ নং গেট, ইমামসানার বাড়িঘর মসজিদসহ ৭/৮ কিলোমিটার সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
কয়রা উপজেলার মহেশ্বর পুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নিশিথ রঞ্জন মিস্ত্রি জানান, জেলার কয়রা উপজেলার কয়েকটি গ্রামে শিবসা নদীর ভাঙ্গন এখন গ্রামবাসী স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। তারা ভাঙ্গনের দৃশ্য অসহায় ভাবে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছেন না। গত বছর কয়রায় নদী ভাঙ্গনের ফলে ৭ টি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে প্লাবিত ছিল। কয়রা উপজেলার কপোত ও শাকবাড়িয়া নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে আংটিহারা, গোয়ালখালি, জোড়শিং, চোরামুখা, হরিহরপুর, কাঠকাটা, বিনাপানি, পাথর খালি, কয়রা, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট এলাকা, মহেশ্বরীপুর কালিবাড়ি, বানিয়াখালি, আমাদী, খাজুরাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা। ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর তেরখাদার আতাই নদীর ভাঙ্গনে পাটগাতি এবং মধুপুর গ্রামের কয়েকটি বাড়ীঘর নদীগর্ভে তলিয়ে যেয়ে ৫ জন মারা গিয়েছিল। সেই নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে যে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল তা এবার আবারও হুমকির মুখে রয়েছে।
পাইকাগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা, বটিয়াঘাটা উপজেলা সদর, গুচ্ছগ্রাম, রায়পুর, বারোআড়িয়া, কেচোরাবাদ এলাকার জনগণ নদী ভাঙ্গনের আতঙ্কে রয়েছে। চালনার পানখালি এলাকা থেকে খলিসাখালি মালোপাড়া পর্যন্ত পীচের রাস্তা সমর্্পুণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে খুলনা-চালনা সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিবসা নদীর ভাঙ্গনে গুনারি কালিবাড়ি, জয়নগর, সুতারখালি, ভিটেডাঙ্গা, কামারখোলা, মোজাম নগর, পানখালি, পোর্দ্দারগঞ্জ, ঢাংমারি এলাকায় ওয়াপদা বেড়িবাঁধে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প থেকে এখনও কোন পদপে নেয়া হয়নি।
ভাঙ্গনের হুমকির মুখে রয়েছে জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিগাতি নদীর তীর। উপজেলার শোভনা ইউনিয়নের বাগঅঁচড়া-বাদুরগাছা ও মনোহরপুর গ্রাম তিনটি চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে তেলিগাতি নদী। ১৯৯৮ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ কিলোমিটার লম্বা একটি বাধ নিমর্ান করলেও সেই বাধের ১৮টি স্থান বর্তমানে ভাঙ্গনের হুমকির মুখে রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মনোহরপুরের কোনা, আড়োখালির খেয়াঘাট, নাপ্তিখালি, পঞ্চাননেনর বাড়ী, পাঁচি খালের গোড়া, গোবিন্দ খালের কোনা, কালিীবাড়ী শ্মশানঘাট, গোলবন প্রভৃতি জায়গাগুলো।
স্থানীয় সুত্রগুলো জানায়, সর্ব প্রথম ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বটিয়াঘাটা উপজেলা সদরের পশ্চিমপাশে কাজীবাছা নদীর ভাঙ্গনে ভেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে যায়। এর পর আরও কয়েকদফা ভাঙ্গনে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে বটিয়াঘাটা উপজেলার সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলো ৩/৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। ওই ভাঙ্গনের ধাক্কা লেগেছিল কাজিবাছার শাখা শৈলমারি নদীতেও। কাজিবাছা এবং শৈলমারি নদীর দ্বি-মূখী ভাঙ্গনে সেবার ১৫ টি ইউনিয়ন সম্পুর্ণ তলিয়ে গিয়েছিল। জোয়ারের প্লাবনে উপজেলার আমন ফসলের মাঠ, শতশত মাছের ঘের এবং পুকুর ভেষে যায়। বেশ কয়েক দিনের জন্য দুর্ভোগে পড়েছিল লাখলাখ মানুষ। সে সময়ে তারা একেবারেই নিরাশ্রয় হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছিল। সে সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজিবাছা নদীর রিং বাধ নির্মানের জন্য প্রাথমিকভাবে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮শত ফুট দৈর্ঘ্যের একটি রিং বাধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও পরে তা কোন কাজে আসেনি। ওই বছরের ডিসেম্বরে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী ভাঙ্গন রোধে ১০ কোটি টাকা বরাদ্ধ দিলেও সে টাকা কোনখাতে ব্যয় হয়েছে তা উপজেলা বাসী দেখতে পায়নি।
সুত্র জানায়, নদীভাঙ্গন রোধে প্রতিবছর কোটি টাকার বরাদ্ধ হয়। তীর রার নামে সেই টাকা লুটপাট হয়। এমপি চেয়ারম্যানের পকেট ভারী হয়। ভাঙ্গন রোধ হয়না। বৃদ্ধি পেতে থাকে নদীর ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো মানুষের সংখ্যা । খুলনার ৭ টি নদীর পানি বর্ষা এলেই তার দুকুল ছাপিয়ে যায়। নদীগর্ভে হারিয়ে যায় একের পর এক গ্রাম। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৫ টি গ্রাম নদী ভাঙ্গনের হুমকির মুখে রয়েছে । দাকোপ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে খুলনার দাকোপ, কয়রা, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি এলাকা নদী ভাঙ্গন কবলিত হয়।
|
|
|
|
|